Home arrow Hon'ble PM's Speech arrow Other Speeches arrow 58th Conference of Bangladesh Judicial Service Association [December 04, 2010]
Print
 

বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশন-এর ৫৮তম সম্মেলন¾উদ্বোধন অনুষ্ঠান

ভাষণ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী

শেখ হাসিনা

ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, শনিবার, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪১৭, ০৪ ডিসেম্বর ২০১০


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

সহকর্মীবৃন্দ,

বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশনের সদস্যবৃন্দ,

সুধিমন্ডলী,

আসসালামু আলাইকুম।

            বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশনের ৫৮তম বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থিত সবাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা। ডিসেম্বর মাস আমাদের বিজয়ের মাস। আমি এই বিজয়ের মাসে শ্রদ্ধা জানাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় চার নেতাসহ সকল শহীদদের প্রতি।

নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষ তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে আদালতের শরণাপন্ন হন। আর আদালতে প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মত গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকেন বিচারকবৃন্দ।

আমাদের জাতীয় জীবনে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশনের সদস্যবৃন্দ নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এ জন্য আমি আপনাদের অভিনন্দন জানাই।

সম্মানিত বিচারকবৃন্দ,

সাধারণ মানুষের ন্যায় বিচার পাওয়া, না পাওয়া নির্ভর করে আপনাদের প্রজ্ঞার উপর। আপনাদের সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত একজন বিচারপ্রার্থীর সর্বনাশের কারণ হতে পারে। কাজেই বিচার কাজ পরিচালনার সময় সব রকমের ভয়-ভীতি, রাগ-অনুরাগ এবং আবেগ পরিহার করে আপনাদের  সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে। দেশের সংবিধান এবং প্রচলিত আইনই আপনাদের সামনে পথ প্রদর্শক।

আইনের শাসন ও গণতন্ত্র একে অপরের পরিপূরক। গণতন্ত্র না থাকলে আইনের শাসন যেমন সুপ্রতিষ্ঠিত হয় না, তেমনি আইনের শাসন না থাকলে গণতন্ত্র টেকসই হয় না। আমাদের সরকার গণতন্ত্র ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সবসময়ই গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে জন্যই ১৯৭২ সালে এমন একটি সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন, যেখানে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তিনি একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়েছিলেন অপরদিকে বাংলাদেশের জন্য উপহার দিয়েছিলেন এই সংবিধান।

কিন্তু পরবর্তীতে সামরিক, আধা-সামরিক শাসকেরা দীর্ঘদিন এদেশ শাসন করেছে। সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে গণতন্ত্রের পাশাপাশি আইনের শাসনের ধারাকে বারবার ব্যাহত করা হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ বিচার বিভাগ পর্যন্ত কলুষিত করা হয়েছিল। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়। হত্যা করা হয় আমার পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে। ১৯৭৫-এর খুনীদের পুরস্কৃত করে রাষ্ট্রদূত করা হয়েছিল।

আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি বলেই ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কোন বিশেষ ট্রাইবুনালে না করে প্রচলিত আদালতেই করেছি। সে সময় অনেকেই বিশেষ ট্রইবুনাল গঠনের কথা বলেছিলেন। আমি এবং রেহানা আমরা বাংলাদেশের একজন সাধারণ মেয়ের মতই পিতা হত্যার বিচার প্রচলিত আদালতেই চেয়েছি।

সুধিবৃন্দ,

            অনেক সংগ্রাম এবং রক্তের বিনিময়ে আমরা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। আমরা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়। আর সে জন্যই বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করেছিলাম। সে অঙ্গীকার অনুযায়ী ইতোমধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের মাধ্যমে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বিচারকগণ এখন নির্ভয়ে, নিরপেক্ষভাবে তাঁদের বিচার কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন। বিচারকগণ যাতে সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বিঘ্নে তাঁদের কাজ করতে পারেন সেজন্য আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি।

বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা আমাদের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে সুপ্রীম কোর্টের এনেক্স বিল্ডিং নির্মাণ করেছিলাম। সেখানে পুরনো ভবন মেরামত ছাড়াও ওভার ব্রিজ নির্মাণ করেছিলাম। সেখানে ৩২টি এজলাস এবং তার সঙ্গে বিচারপতিদের খাস কামরার ব্যবস্থা করা হয়। আইন সংস্কারের জন্য আমরা আইন কমিশন প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। ধানমন্ডিতে জুডিশিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশনের ভবনটিও আমি সে সময় আপনাদের দিয়েছিলাম। আমাদের বিগত সরকারের মেয়াদের পর আর কোন সরকার এর উন্নয়নে এগিয়ে আসেনি জেনে আমি বিস্মিত। একটি Project-এর মাধ্যমে এই ভবনটির উন্নয়নের জন্য আমরা প্রয়োজনীয় সহায়তা দেব।

            কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির জন্য বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলায় চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রায় ৭৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে ৩৭টি জেলায় জমি অধিগ্রহণ ও ২৭টি জেলায় আদালত ভবনের ব্যয় অন্তর্ভূক্ত আছে। ইতোমধ্যে ৩৪টি জেলায় আদালত ভবন নির্মানের কাজ চলছে।

কিন্তু ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয়তা এবং জমির দুষ্প্রাপ্যতার বিষয়টি বিবেচনা করে ১২তলা ভিত্তির উপরে ৬তলা ভবন নির্মাণের জন্য প্রকল্পটি সংশোধন করার বিষয়টি বিবেচনাধীন আছে। সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় হবে ৮৬৮ কোটি টাকা। আমাদের বিগত সরকারের সময় আমরা বিচার বিভাগকে আধুনিক করার জন্য ২১৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সরকার তা অব্যাহত রাখেনি।

আপনারা জানেন, কাজের গতি বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য আমরা তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। বিচার বিভাগকে আধুনিক এবং যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিচার বিভাগকে Digitalized করার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট এবং জেলা পর্যায়ের ২০০টি আদালতে তথ্য প্রযুক্তি স্থাপনের জন্য প্রাথমিকভাবে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, বিচারকগণের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তাঁদের উচ্চতর শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সম্মানিত বিচারকবৃন্দ,

            অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আপনাদের বেতন-ভাতাসহ অনান্য সুযোগসুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে বর্তমান সরকার সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

আমরা ইতোমধ্যেই জুডিসিয়াল পে-কমিশনের রিপোর্ট আংশিক বাস্তবায়ন করেছি। আমরা প্রথমবারের মত বিচারকদের জন্য ৩০ শতাংশ বিশেষ ভাতা প্রদান করছি। উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী বিচারকদের অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রদানের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। এছাড়া বিচারকদের জন্য পৃথক আবাসন এলাকা তৈরি করার বিষয়টিও আমরা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছি। প্রত্যেক জেলাতে আবাসন প্রকল্প করা হবে। সেখানে বিচার বিভাগের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। বিচারকদের নিরাপত্তার বিষয়েও আমাদের সরকার সজাগ রয়েছে। প্রত্যেক জজের বাড়িতে নিরাপত্তা কর্মকর্তা থাকবে সে ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করব।

কথায় আছে Justice delayed, justice denied । বিচারপ্রার্থীরা যাতে সময়মত বিচার পায়, সেজন্য আপনাদের আরও আন্তরিক হতে হবে। আমি জানি, নিম্ন আদালতে আমাদের বিচারক স্বল্পতা রয়েছে। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতোমধ্যে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ২১২ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছি। খুব শিগগিরই আরও ১০১ জন ম্যজিস্ট্রেট নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এন্ট্রি লেভেলে পদ শূণ্য হলেই সেগুলো দ্রুত পূরণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

ইতোমধ্যে বিভিন্ন সত্মরে পদোন্নতি দিয়ে আপনাদের পদোন্নতির যে জট ছিল তার অবসান করেছি।

অপরাধীরা যাতে উপযুক্ত শাস্তি পায় এবং নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে শাস্তি না পায় সে ব্যাপারে আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে। অনেক সময় যথাযথ তদন্তের অভাবে অনেক মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। বিচারপ্রার্থীরা সুষ্ঠু বিচার পায় না। যুগের সাথে সাথে অপরাধের ধরণও পাল্টেছে। এ জন্য আমরা পুলিশ বিভাগে পৃথক তদন্ত বিভাগ গঠনের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছি।

দেশের সকল নাগরিকের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা মানবাধিকার কমিশন গঠন করেছি। তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তথ্য কমিশন গঠন করা হয়েছে।

আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই গরিব। মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেকে বিচারের আশায় আদালতে যেতে চায় না। আপনাদেরকে দ্রুততম সময়ে মামলা নিষ্পত্তির আহবান জানাচ্ছি। মনে রাখবেন, বিচারের বাণী নীরবে ও নিভৃতে যেন না কাঁদে। ধনী-গরীব সবাই যেন সুবিচার পায়।

সুধিবৃন্দ,

            আমরা দেশের প্রশাসন, বিচার বিভাগসহ সর্বস্তরে গতিশীলতা আনয়ন এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমরা এমন একটা সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে সকল নাগরিক তাঁদের মৌলিক অধিকার ভোগ করে নিজেরা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করতে পারবে। 

২০২০ সালে জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী। ২০২১ সালে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। ২০২১ সালের মধ্যে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিকে একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ ও আলোকিত রাষ্ট্রে পরিণত করে বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা' বাস্তবায়ন করতে আমরা বদ্ধপরিকর। আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করে মহান মুক্তিযুদ্ধের সুফল বাংলার প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে চাই।

আমি আশা করি আমাদের লক্ষ্য পূরণে আপনারা বিচারকবৃন্দ অবশ্যই সততা, নিরপেক্ষতা এবং পেশাদারী মনোভাব নিয়ে জনগণকে ন্যায়বিচার পাওয়ার ন্যায্য অধিকার পুরণে সবসময় সচেষ্ট থাকবেন। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের নিজ নিজ অবস্থান হতে সর্বোচ্চ শক্তি ও সামর্থ দিয়ে একটি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলব ইনশাআল্লাহ।

আপনাদের সকলকে আবারও অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশনের ৫৮তম বার্ষিক সম্মেলনের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।

খোদা হাফেজ।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু

বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

.....

 

Press Briefing

Press Release

Contact Info

Contact
Prime Minister's Office
Old Sangsad Bhaban
Address:  Tejgaon, Dhaka-1215
                    Bangladesh
E-mail:   This e-mail address is being protected from spam bots, you need JavaScript enabled to view it