|
জাতীয় যুব দিবস-২০১০¾উদ্বোধন অনুষ্ঠান
ভাষণ
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা
ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, বুধবার, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪১৭, ০৮ ডিসেম্বর ২০১০
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সহকর্মীবৃন্দ,
উপস্থিত সুধিমন্ডলী,
যুব ভাই ও বোনেরা,
আসসালামু আলাইকুম।
শীতের এই স্নিগ্ধ সকালে সবাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা।
ডিসেম্বর মাস মহান বিজয়ের মাস। আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে। স্মরণ করছি ৩০ লাখ বীর শহীদ এবং ২ লাখ মা-বোনকে যাদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বপ্নের স্বাধীনতা। সহমর্মিতা জানাচ্ছি শহীদ পরিবারের সদস্য এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের।
সুধিমন্ডলী,
বাংলাদেশ এক গর্বিত ও সাহসী তারুণ্যের দেশ। দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুব সমাজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে, ৫২'র ভাষা আন্দোলনে, ৬২'র শিক্ষা আন্দোলনে, ৬৬'র ছয়দফার সংগ্রামে, ৬৯'র গণঅভ্যুত্থানে, ৭১'র মহান মুক্তিযুদ্ধে, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এ দেশের যুবসমাজ আত্মত্যাগের যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, জাতি তা চিরদিন স্মরণ করবে।
যুবরাই দেশের চালিকাশক্তি। যুব সমাজের দুর্বার কর্মস্পৃহা একটি দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। যুবকদের অদম্য মনোবল যেকোন অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। একবিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্নে যুবদের শ্রম, মেধা এবং প্রাণশক্তির যথাযথ ব্যবহারই পাল্টে দিতে পারে দেশের চেহারা।
যুবসমাজ শক্তি, উদ্যম, উদ্ভাবন আর কর্মপ্রেরণার প্রতীক। তাঁরাই পারে একটি দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনীতির ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে। বাঙ্গালী যুবকেরা এভারেষ্ট জয় করেছে। ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেছে। এই তরুণরাই পারবে দিন বদলের সনদ বাসত্মবায়ন করতে। তাঁর প্রতিফলন আমরা ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেখেছি।
এই নির্বাচনের সময় প্রায় সোয়া কোটি নতুন ভোটার ছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সবসময়ই যুবশক্তিকে মূল্যায়ন করে। মূলতঃ তাঁদেরকে লক্ষ্য করেই আমরা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিলাম। ঘোষণা দিয়েছিলাম ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। দেশের যুবসমাজ আমাদের আহবানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে বিপুলভাবে ভোট দিয়েছে। আমাদেরকে বিজয়ী করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু করি। আমরা মনে করি একমাত্র উপযুক্ত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমেই যুবকদের দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতে পারে।
আমাদের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবসমাজ। জনসংখ্যার এই বিপুল অংশকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারলে প্রকৃত জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনে আমরা যুব সমাজের কর্মসংস্থানের উপর গুরুত্ব দিয়েছি। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে যুবক/যুব মহিলাদের জন্য তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
আমরা যখন ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করি তখন সাভারের যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে খুব খারাপ অবস্থা ছিল। আমরা সেখানে ৫০টি ট্রেডে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলাম। সে সময় আমরা কর্মসংস্থান ব্যাংকের সৃষ্টি করি। কোন সহযোগী জামানত ছাড়াই ৫০ হাজার টাকা বেকার যুবকদের লোন প্রদান করি। এবার আমরা সেটা ১ লক্ষ টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী দেশব্যাপী ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় শিক্ষিত বেকার যুবক/যুব মহিলাদের জাতিগঠনমূলক কর্মকান্ডে ২-বছর মেয়াদী অস্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে কুড়িগ্রাম, বরগুনা ও গোপালগঞ্জ জেলায় পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সকল জেলায় এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে।
রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এ পরিকল্পনায় যুব কার্যক্রমকে গুরুত্ব সহকারে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
সুধিমন্ডলী,
যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশব্যাপী উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ ও ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার যুবক/যুবমহিলাকে ৩৬টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় শতকরা প্রায় ৫৬ ভাগ প্রশিক্ষণার্থী নিজেদের স্বকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। পাশাপাশি অন্যান্য যুবকদের কর্মসংস্থানের পথ দেখিয়েছে।
বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ। আমাদের দেশটা ছোট হলেও আমাদের সম্পদের ঘাটতি নেই। আমাদের আছে ঊর্বর মাটি। অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর এবং মেধাবী মানবসম্পদ।
জাতির পিতা বলতেন যে দেশের মাটিতে বীজ ফেললেই চারা গজায়, কিংবা পানিতে পোনা ছাড়লেই আপনা-আপনি মাছ বড় হয় সে দেশের মানুষ বেকার বা দরিদ্র থাকতে পারে না।
অথচ, চারদিকে চোখ ফেরালেই আমরা দেখি প্রচুর খাল, নালা, পুকুর ও দীঘি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এগুলো সংস্কার করে প্রচুর মৎস্য সম্পদ উৎপাদন করা সম্ভব। আমাদের ঊর্বর মাটিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণে কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন করা যায়। আমাদের যুবসমাজ খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প সমবায়ের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে পারে। যুবকরা যাতে বিপথে না যায় সেদিকে আমাদের সকলের দৃষ্টি রাখতে হবে।
যুব সম্প্রদায়কে সঠিক পথে পরিচালিত করতে না পারলে আমরা কখনই স্বনির্ভর জাতিতে পরিণত হতে পারব না। আমরা প্রতিটি বেকার যুবকের হাত কর্মীর হাতে পরিণত করতে চাই।
যুব ভাইবোনদের অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে চলবে না। একটা চাকুরির আশায় দ্বারে দ্বারে ধরণা দেওয়ার পরিবর্তে নিজেদেরকে উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত করা অনেক ভাল।
সরকার তোমাদের পাশে আছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। আমরা এসএমই খাতে সহজ শর্তে এবং কম সুদে ব্যাংক ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। মেয়েদের জন্য বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা চাই অন্যের মুখাপেক্ষী না থেকে আমাদের প্রতিটি যুবক নিজেদের পায়ে দাঁড়াক। তাতে নিজেদের যেমন উন্নতি হবে, তেমনি দেশের উন্নতি হবে।
আমি যুব ভাইবোনদের আহবান জানাই, আসুন আমরা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে আত্ম-কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করি।
আমি এখানে কিছুটা দুঃখের সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, আমাদের যুব সমাজের একটা অংশ অনেক সময় ভুল পথে পা বাড়ায়। মাদকাশক্তিসহ নানা সমাজবিরোধী কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে পড়ে। এটা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। এ ক্ষেত্রে শুধু যুবকদের উপর দোষ চাপালেই চলবে না, তাঁদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব সমাজের প্রতিটি অভিভাবকের।
তাঁদেরকে আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস, আমাদের হাজার বছরের পারিবারিক বন্ধন, মূল্যবোধ এসব বিষয়ে সম্যক ধারণা দিতে হবে। এজন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। একজন সচেতন যুবক কখনই বিপথে যেতে পারে না। আমাদের যুব সমাজ যদি বিপথে যায়, সেটি হবে আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা।
যুব ভাই ও বোনেরা,
জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলা গড়ে তোলা। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন-আমাদের যুবসমাজ অপার সম্ভাবনাময় এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তাদের দিয়েই জাতির সার্বিক উন্নয়ন অর্জন সম্ভব। তাই দেশ গড়ার এই মহান কাজটি তিনি যুবদের দ্বারাই সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন। আমরা যদি যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করতে পারি, তবে দারিদ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কেন বিজয় আনতে পারব না?
জাতির পিতার জীবদ্দশায় সোনার বাংলা গড়ার কাজ তিনি শুরু করে গেলেও তা শেষ করে যেতে পারেননি। আজ এদেশের যুবদের সামনে সময় এসেছে জাতির পিতার সেই রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ শেষ করার।
দেশের যুব সমাজের প্রতি আমার অনুরোধ- দেশ গড়ার মহান ব্রত নিয়ে আমাদের সকলকে এগিয়ে যেতে হবে এবং বর্তমান শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হতে হবে।
যুবদেরকে নৈতিকতা, সততা, দেশপ্রেম, মানবতাবোধ ইত্যাদি গুণাবলীতে সমৃদ্ধ হতে হবে। দেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণের জন্য তোমাদেরকে আহবান জানাচ্ছি। তোমরাই পারবে জাতির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে।
স্মরণ রাখবে, তোমাদের যেন কেউ বিপথে ঠেলে দিতে না পারে। দলীয় এবং ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর হতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যেসব সফল যুবক ও যুবমহিলা আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃষ্টান্তমূলক অবদান রাখার জন্য পুরস্কার পেয়েছ, তাদেরকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। তোমরা নিজেদের প্রকল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামের হত দরিদ্রদের উন্নয়নে এবং বেকার যুবদের স্বকর্মে নিয়োজিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাবে।
৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের যুব সমাজ দেশকে পিছিয়ে থাকতে দেবে এটা আমি বিশ্বাস করি না। তোমরা জেগে উঠলে বাংলাদেশ জেগে উঠবে। সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য সোনার ছেলে চাই। এই সোনার ছেলে হল যুবসমাজ। তোমরা স্বাবলম্বী হলে বাংলাদেশ স্বাবলম্বী হবে।
২০২১ সালে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হবে। আমরা এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতামুক্ত আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক উন্নত বাংলাদেশে রূপান্তরিত করতে চাই। এ কাজে যুবশক্তিই আমাদের প্রধান হাতিয়ার। তোমাদের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করার উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।
সবাইকে আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে আমি জাতীয় যুবদিবস ২০১০ এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।
খোদা হাফেজ।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
.......
|