|
ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা
¾পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান
ভাষণ
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, মঙ্গলবার, ০৭ পৌষ ১৪১৭, ২১ ডিসেম্বর ২০১০
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
সহকর্মীবৃন্দ,
সংসদ সদস্যগণ,
প্রিয় শিশু-কিশোর ভাই-বোনেরা,
সুধিমন্ডলী,
আসসালামু আলাইকুম।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত জাতীয় শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে সবাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা।
মহান বিজয়ের মাসে আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় চার নেতাকে। গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি ৩০ লাখ শহীদ আর ২ লাখ নির্যাতিত মা-বোনকে। যাঁদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের মহান স্বাধীনতা।
সুধিমন্ডলী,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন আমার একটি প্রিয় প্রতিষ্ঠান। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামের জন্য যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন তার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
এ প্রতিষ্ঠান ইসলামে প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। জাতীয় শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নানামুখী কর্মকান্ডের মধ্যে একটি। আমাদের শিশু-কিশোররা যাতে ইসলামের শাশ্বত শিক্ষায় আলোকিত হয়ে তাদের জীবন সুন্দরভাবে গঠন করতে পারে এজন্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে।
জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদের সন্তানদের প্রতিযোগিতা মনষ্ক করে গড়ে তুলতে হবে। আল্লাহতাআলা আমাদের সৎ কাজে প্রতিযোগিতা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতাআলা বলেন, ‘‘তোমরা সৎ কাজে প্রতিযোগিতা কর।''
আমি বিশ্বাস করি ভাল কাজে প্রতিযোগিতার মনোভাব দেখানোর মাধ্যমেই দেশ ও জাতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
সুধিমন্ডলী,
শিশুরা হচ্ছে জাতির ভবিষ্যত, আমদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এই সোনার বাংলার আগামীদিনের উত্তরাধিকারী। আমার সামনে যে প্রতিভাদীপ্ত শিশু-কিশোররা বসে আছে, তাদের অনেকেই একদিন বিভিন্ন স্তরে দেশের নেতৃত্ব দেবে।
এজন্য তাদেরকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আমাদের বীরত্বগাঁথা, আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য সম্পর্কে শিশু-কিশোরদের সঠিকভাবে জানাতে হবে।
আমরা চাই, যারা আগামীতে এ দেশের নেতৃত্ব দেবে সেই শিশু-কিশোররা নিজের দেশকে চিনুক, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হোক। যাতে তাঁরা স্বার্থান্বেষী মহলের বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ না হয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম এই দেশে মুক্ত মনে বিকশিত হতে পারে।
প্রিয় ছোট্ট সোনামণিরা,
তোমাদের মাঝে এলে আমার মনে পড়ে আমার ছোট্ট ভাই রাসেলের কথা। ১০ বছরের শিশু রাসেল। যার একমাত্র আবদার ছিল একটি সাইকেল কিনে দেওয়ার। ঘাতকরা তাকেও রেহাই দেয়নি। রাসেল মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিল। ঘাতকরা মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেয় তাঁর ছোট্ট দেহটি।
স্বাধীনতা বিরোধী চক্র শুধু জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করেই ক্লান্ত হয়নি, খুনীদেরকে বিচার থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল। বিদেশে লোভনীয় চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিল। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে ন্যায় বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল ।
ঘাতকেরা চেয়েছিল, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে বাংলার অগ্রযাত্রাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার। কিন্তু আল্লাহর অসীম ইচ্ছায় তা হয়নি। আমরা বাংলাদেশকে প্রতিটি শিশুর জন্য একটি আদর্শ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে রাসেল হত্যার প্রতিশোধ নিব, ইনশাআল্লাহ।
তোমরা উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে আজ জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হয়েছ। তোমাদের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে পেরে আমি নিজেও আনন্দিত।
তোমরা ভাগ্যবান। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক ভাগ্য-বঞ্চিত শিশুকিশোর রয়েছে। তাদের হয়তো মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। সেসব বঞ্চিত, অবহেলিত শিশুদের জন্যে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে।
আমরা ইতোমধ্যে শিশুদের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আশা করি, সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে আমরা প্রতিটি মানুষের কাছে আমাদের স্বাধীনতার সুফল পোঁছে দিতে পারব।
ছোট্ট বন্ধুরা, রাসেলের বোন হিসেবে, তোমাদের প্রিয় বোন হিসেবে, আমি কথা দিচ্ছি, আমি সব সময় তোমাদের পাশে থাকব। তোমাদের কল্যাণে আমাদের যা কিছু করার আছে আমরা তা করে যাব।
সমবেত সুধিমন্ডলী,
শিশুরা আমাদের জাতীয় জীবনের উদীয়মান সূর্য। তাদেরকে সযত্ন ও সঠিকভাবে গড়ে তোলার মাধ্যমেই আমরা আমাদের জাতীয় জীবনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে নিশ্চিত করতে পারি। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘‘তোমাদের সন্তানদের সুশিক্ষা দিও। কেননা তাদের এমন যুগে বসবাস করতে হবে, যা সরল পথে চলার জন্য সহজসাধ্য হবে না।''
মহানবী (স.) এর এই নির্দেশের তাৎপর্য পরিপূর্ণভাবে উপলদ্ধি করে শিশু-কিশোরদের আবেগপ্রবণ মন যাতে একটি সুষ্ঠ ও সঠিক পরিবেশে গড়ে উঠতে পারে, সে জন্য আমাদের সব সময় সচেষ্ট থাকতে হবে।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ। তাঁর সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল মহানবীর ঐতিহাসিক মদীনা-সনদের ঘোষণার আলোকে বাংলাদেশকে সকল ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ভূমি হিসেবে গড়ে তোলা। যেখানে সকল ধর্মের মানুষ অবাধে, নিরাপদে, নির্বিঘ্নে তাঁদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে তাঁর একাধিক বাস্তবমুখী পদক্ষেপের প্রতি আমরা দৃষ্টি দিলে আমরা তার দৃষ্টান্ত দেখতে পাব। ইসলামের বিধানে মদ, জুয়া, রেস খেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একমাত্র বঙ্গবন্ধুই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে মদ, জুয়া, গাঁজা, আফিমের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ১৯৭৪ সালে ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে ওআইসি'র সদস্যভুক্ত করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু বাংলার মাটিতে সত্যিকার ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে আমি ও আমার সরকার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যেই বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আলেম-ওলামাগণের কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আমি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে দেশের ইমাম ও আলেম সমাজের কল্যাণে আরও ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।
সুধিমন্ডলী,
বাংলাদেশ একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের আদর্শ সৃষ্টি করে আমরা বিশ্ববাসীর কাছে প্রশংসিত হয়েছি। আমাদের এ ঐতিহ্যকে যে কোন মূল্যে ধরে রাখতে হবে।
আমরা লক্ষ্য করছি, পাকিস্তান আমলে যেমন ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকচক্র মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, তাদেরই আদর্শপুষ্ট স্বাধীনতা বিরোধী একটি চক্র ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে দেশের সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের ভিত নষ্ট করার চেষ্টা করছে।
দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন তারা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের মাধ্যমে দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করছে। এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দেশের আলেম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার জন্য আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।
ইসলামে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের কোন স্থান নেই। কেউ যাতে ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে এসব ধ্বংসাত্মক কাজে মদদ যোগাতে না পারে এজন্য আমি সবাইকে সচেতন থাকার আহবান জানাচ্ছি।
আমি দৃঢভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশের আলেম সমাজ অতীতে কখনই সন্ত্রাস ও জঙ্গী তৎপরতার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না, বর্তমানেও নেই এবং ভবিষ্যতেও তাঁরা এ ধরনের তৎপরতাকে প্রশ্রয় দেবেন না।
সুধিমন্ডলী,
বাল্য বিবাহ, যৌতুক, নিরক্ষরতা, নারী ও শিশু পাচার, নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা, মাদকাসক্তি এখনও আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। ইসলামের শিক্ষার মর্মবাণী জনগণের সামনে তুলে ধরে আমরা সহজেই এদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরাধ গড়ে তুলতে পারি। এজন্য সবাইকে সমবেত হয়ে কাজ করার জন্য আমি সবাইকে আহবান জানাচ্ছি।
ইভটিজিং নামে স্কুল-কলেজগামী মেয়েদেরকে উত্যক্ত করার এক ভয়াবহ প্রবণতা ইদানিং আমাদের তরুণদের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটা বন্ধ করার জন্য আমি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। পাশাপাশি আমি অভিভাবক এবং আলেম সমাজকে অনুরোধ জানাব এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত জাতীয় শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ও বিজয়ীদের আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। জীবনের সকল পর্যায়ে আমি তাদের সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করি।
অভিভাবকদের প্রতি আমার আহবান, একটি সুখী-সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক সোনার বাংলা তৈরিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে আমাদের সবটুকু সামর্থ্য ঢেলে দেই।
সবাইকে আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি। পরম করুণাময় আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
খোদা হাফেজ।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
.....
|