|
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী¾শীতকালীন গ্র্যাজুয়েশন কুচকাওয়াজ-২০১০
ভাষণ
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা
যশোর, সোমবার, ১৩ পৌষ ১৪১৭, ২৭ ডিসেম্বর ২০১০
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সহকর্মীবৃন্দ,
সংসদ সদস্যবৃন্দ,
তিন বাহিনী প্রধানগণ,
বিমান বাহিনী একাডেমির কমান্ড্যান্ট,
সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ,
প্রিয় ফ্লাইট ক্যাডেটবৃন্দ,
উপস্থিত সুধিমন্ডলী।
আসসালামু আলাইকুম।
শীতের এই স্নিগ্ধ সকালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী একাডেমির বর্ণাঢ্য প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।
আজকের এদিনে আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে দেশপ্রেমিক বাঙালি বিমানসেনাগণ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমি শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় চার নেতাকে। আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি শহীদ বিমানসেনাদের। গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি ৩০ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং ২ লাখ নির্যাতিত মা-বোনকে যাঁদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগে অর্জিত হয়েছে আমাদের মহান স্বাধীনতা। আমি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও স্বজনহারা পরিবারের প্রতি জানাই আমার আন্তরিক সহমর্মিতা।
কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সামরিক প্রশিক্ষণের প্রাথমিক ধাপ সফলতার সঙ্গে শেষ করে যারা আজ কমিশন পেতে যাচ্ছ, তোমাদেরকে জানাই আমার অভিনন্দন।
সুধিবৃন্দ,
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যে কোন জাতির জন্য একটি শক্তিশালী, পেশাদার ও আধুনিক বিমান বাহিনী অপরিহার্য। এ জন্যই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর পরই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট বিমান বাহিনীকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেন। তিনি ১৯৭৩ সালেই সে সময়ের অত্যাধুনিক মিগ-২১ সুপারসনিক ফাইটার স্কোয়াড্রন, এমআই-৮ হেলিকপ্টার স্কোয়াড্রন, এএন-২৪ পরিবহন বিমান স্কোয়াড্রন এবং চারটি রাডার বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সংযোজন করেন।
২১ বছর পর দায়িত্ব নিয়ে আমরা ১৯৯৬-২০০১ সময়ে বিমান বাহিনীকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করার পদক্ষেপ নেই। আমরা ২০০০ সালে বিমান বাহিনীতে ৪র্থ প্রজন্মের অত্যাধুনিক মিগ-২৯ জঙ্গী বিমান, বড় পরিসরের সি-১৩০ পরিবহন বিমান এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার সংযোজন করি।
এবারও দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা বিমান বাহিনীকে শক্তিশালী, দক্ষ এবং আধুনিক করে গড়ে তোলার কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। এজন্য বিমান বাহিনীতে বিভিন্ন অত্যাধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম সংযোজন এবং ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রক্রিয়া চলছে।
আমরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে প্রথমবারের মত ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপনযোগ্য অত্যাধুনিক ক্ষেপনাস্ত্র সংযোজনের ব্যবস্থা নিয়েছি।
এছাড়াও দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আমাদের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাসমূহ, বিশেষ করে আমাদের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, কক্সবাজারে একটি পূর্ণাঙ্গ বিমান বাহিনী ঘাঁটি স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই ঘাঁটির নির্মাণ কাজ শিগগিরই শুরু হবে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সদস্যদের উন্নততর প্রশিক্ষণের জন্য আধুনিক সুবিধাসহ বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজকেই এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হতে যাচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে যে বিমান বাহিনীর জন্ম হয়েছিল, তা আজ একটি পরিপূর্ণ ও সুসংগঠিত বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আমি নিশ্চিত, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যে লালিত আমাদের প্রিয় বিমান বাহিনী যে কোন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদা প্রস্ত্তত থাকবে।
প্রিয় ফ্লাইট ক্যাডেটবৃন্দ,
কমিশন প্রাপ্তির এ শুভলগ্নে আমি তোমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, সামরিক জীবনে পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য কঠোর শৃঙ্খলাবোধ, প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের কোন বিকল্প নেই। দীর্ঘ প্রশিক্ষণের সফল সমাপ্তির এ পর্যায়ে উন্নীত হতে তোমরা স্বীকার করেছ অনেক ত্যাগ, অতিক্রম করেছ কঠিন স্তর। বিমান বাহিনী একাডেমি থেকে যে মৌলিক প্রশিক্ষণ তোমরা গ্রহণ করেছ, তা যথাযথ অনুশীলন ও প্রয়োগের মাধ্যমে পেশাগত মানোন্নয়নের জন্য সচেষ্ট থাকবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মনে রাখবে, তোমরাই এই বিমান বাহিনীর ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তাই ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে তোমাদের নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। আমার বিশ্বাস- তোমাদের সাহসিকতা, ধৈর্য্য, বিচক্ষণতা, তীক্ষ্ণ মেধা এবং গতিশীল নেতৃত্বে আমাদের বিমান বাহিনী ভবিষ্যতে আরও উন্নত ও পেশাদারী হয়ে উঠবে।
তোমাদের মনে রাখতে হবে, বিমান বাহিনী যে কোন নতুন সংযোজন যথেষ্ট ব্যয়বহুল। এর প্রতিটি মূল্যবান সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আগামীদিনগুলোতে তোমাদের উপর অর্পিত হবে। তোমাদের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান এবং কর্মজীবনে জ্যেষ্ঠদের সঠিক দিক নির্দেশনাকে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করে যে কোন গুরুদায়িত্ব পালনে তোমরা সফল হবে।
বাংলার আকাশ মুক্ত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার, তোমাদের চিন্তা-চেতনা ও কর্মে প্রতিফলিত হবে প্রতিদিন- এ কামনা করছি। দেশ রক্ষার গুরুদায়িত্বের পাশাপাশি অতীতের মত ভবিষ্যতেও তোমরা এদেশের মানুষের যে কোন প্রয়োজনে তাঁদের পাশে এসে দাঁড়াবে।
মনে রাখবে, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান এবং শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকসহ অসংখ্য বীরের ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। তাঁদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা। তাঁদেরই অনুগামী হিসেবে এই কষ্টার্জিত স্বাধীনতা রক্ষার মহান দায়িত্ব এখন তোমাদের।
সততা, একাগ্রতা ও নিষ্ঠায় অবিচল থেকে দেশগড়া ও দেশ রক্ষায় তোমরা নিজেদেরকে উৎসর্গ করবে- এদেশের মানুষ তাই প্রত্যাশা করে।
আমাদের বিমান বাহিনী জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তাঁদের কর্তব্যনিষ্ঠা ও উন্নত পেশাদারিত্ব প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
আমাদের সরকার শান্তিরক্ষা মিশনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অংশগ্রহণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আমরা শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর Force Structure ৭২৪ থেকে বৃদ্ধি করে ১ হাজার ৬১৭ জনে উন্নীত করেছি।
গত এক বছরে শান্তিরক্ষা মিশনে বিমান বাহিনী সদস্যদের অংশগ্রহণ বিগত বছরগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই প্রথমবারের মত বিমান বাহিনীর C-১৩০ পরিবহন বিমান কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো হয়েছে। মধ্য আফ্রিকার প্রজাতন্ত্র চাদে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার কন্টিনজেন্ট আইভরিকোস্টে পাঠানো হয়েছে।
প্রিয় মহিলা ফ্লাইট ক্যাডেটবৃন্দ,
এই মনোজ্ঞ সামরিক কুচকাওয়াজে তোমাদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে আমি সত্যিই অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। তোমাদের এই কমিশন প্রাপ্তি বর্তমান সরকারের নারীর অধিকার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জনের দৃঢ় নীতিরই প্রতিফলন।
তোমাদের নিশ্চয় মনে আছে, আমরাই ২০০০ সালে প্রথম সশস্ত্র বাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে নারীদের অন্তর্ভূক্তির এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি জাতীয় অগ্রগতিতে নারীর অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আজকের এই কুচকাওয়াজে ৩৩ জন কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের মধ্যে ১০ জন নারীর উপস্থিতি সেই অঙ্গীকার পূরণের স্বাক্ষরই বহন করে।
আমি জেনে অত্যন্ত খুশি হয়েছি যে, বিমান বাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত মহিলা কর্মকর্তাগণও যোগ্যতার সঙ্গে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি বিমান বাহিনীর মহিলা কর্মকর্তারাও বিশ্ব শান্তিরক্ষায় অংশগ্রহণ করে আসছেন।
আমি তোমাদেরকে বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাচ্ছি এবং তোমাদের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।
সুধি,
আমরা যখনই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করি, সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কাজ করি। দারিদ্র্য আমাদের প্রধান শত্রু। এজন্য আমরা দারিদ্র্য বিমোচনের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করছি।
বিগত প্রায় ২ বছরে আমরা কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, রাস্তাঘাট তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্য-প্রযুক্তিসহ সামাজিক উন্নয়ন খাতে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রভূত সাফল্য অর্জন করেছি।
ইতোমধ্যেই ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে। ৩০টি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ চলছে এবং ১০টির কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
সারের দাম ৯০ টাকা থেকে কমিয়ে ২২ টাকা করা হয়েছে। কৃষি কার্ড চালু করা হয়েছে এবং কৃষকের জন্য ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সারাদেশে ১০ হাজার কম্যুনিটি ক্লিনিক চালু করা হয়েছে। চার হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সারাদেশে ৫ হাজারেরও বেশি ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
রপ্তানি আয় এবং রেমিটেন্স বৃদ্ধির ফলে রেকর্ড ১০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে উঠেছে।
যানজট নিরসনে ঢাকায় বিজয় সরণী এবং টঙ্গীতে ২টি উড়াল সেতুর উদ্বোধন করা হয়েছে। গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি এবং কুড়িল ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ চলছে। এয়ারপোর্ট থেকে মাওয়া পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কাজও খুব শিগগিরই শুরু হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য আগামী মাসে চুক্তি স্বাক্ষর হবে এবং মার্চ মাসের মধ্যেই মূল সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হবে, ইনশাআল্লাহ।
বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজ আমরা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছি। এ বছর শিশুমৃত্যুর হার কমানোর জন্য এমডিজি পুরস্কার অর্জন করেছি।
এ দেশ আমাদের সবার। আমাদের সবাই মিলে কাজ করলে বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে ইনশাআল্লাহ। সবার সহযোগিতায় আমরা ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত, অসাম্প্রদায়িক মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করব।
আজকের এ সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। নবীন কর্মকর্তাদের কর্মময় জীবনের সাফল্য কামনা করছি। সবাইকে আবারও আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
খোদা হাফেজ।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
বাংলাদেশ চিরজীবী হউক।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী চিরজীবী হোক।
......
|