|
জেলা প্রশাসক সম্মেলন¾২০০৯ উদ্বোধন অনুষ্ঠান
ভাষণ
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ শ্রাবণ ১৪১৬, ২৮ জুলাই ২০০৯
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ, সম্মানিত উপদেষ্টাগণ, সচিববৃন্দ, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ এবং বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকবৃন্দ, আসসালামু আলাইকুম। জেলা প্রশাসকদের আজকের এ সম্মেলনে আমি আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। জেলা প্রশাসকগণ মাঠ পর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। আপনাদের মাধ্যমেই সরকার তার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং জনকল্যাণ ও উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন করে থাকে। মাঠ পর্যায়ের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হিসাবে আপনারাই জনগণ এবং সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করে থাকেন। প্রিয় বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকবৃন্দ, গত বছরের ২৯ জানুয়ারি একটি অবাধ, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। জনগণ তাঁদের রায় প্রদানের মাধ্যমে আমাদের উপর যে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে তার যথাযথ প্রতিদান আমাদের দিতে হবে। বর্তমান সরকারের কাছে জনসাধারণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। পাশাপাশি এই বিপুল জনসমর্থন আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারের তার একটি নিজস্ব দর্শন ও ভিশন থাকে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান সরকারের সকল কর্মকান্ডের মূল দর্শন হচ্ছে এদেশের গরীব খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন। আগামী ২০২০ সাল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী। ২০২১ সাল আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। আমরা অঙ্গীকার করেছি ২০২১ সালের বাংলাদেশ হবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশ। আমরা চাই, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ হবে একটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত, আধুনিক, সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র। আমরা সামাজিক ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমরা বিগত নির্বাচনী ইশতেহারে দিন বদলের সনদ ‘ভিশন ২০২১' ঘোষণা করেছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের পদক্ষেপ হিসেবে আমরা সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ই-গর্ভনেন্স চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। পর্যায়ক্রমে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকেও ই-গভর্নেন্স এর আওতায় আনা হবে। মাঠ পর্যায়ের কাজের সমন্বয়কারী হিসেবে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। দেশের জনসাধারণকে তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা প্রদানের জন্য আপনাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। পদবীর পাশে ‘প্রশাসক' থাকলেও আপনাদের হতে হবে জনগণের সেবক। একটা সময় ছিল যখন সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদেরকে শাসক হিসেবে মনে করত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। এখন জনগণকে সম্পৃক্ত করেই প্রতিটি উন্নয়ন কাজ করতে হয়। আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। জনগণের বন্ধু হতে পারলেই আপনি আপনার দায়িত্ব পালনে শতভাগ সফল হবেন। মনে রাখবেন, সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের পয়সায় আমার-আপনার বেতন-ভাতা হয়। কাজেই তাঁদের দুঃখ-বেদনা, সুখ-দুঃখের সঙ্গী আমাদের হতে হবে। তাঁদের সঙ্গে মিশতে হবে, কথা বলতে হবে, তাঁদের সমস্যা-সম্ভাবনা সর্ম্পকে জানতে হবে। আপনারা মাঠ পর্যায় থেকে জনগণের কথা জেনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানালে, আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারব। প্রিয় জেলা প্রশাসকবৃন্দ, আমাদের সরকার চায়, একটি টেকসই গণতন্ত্র, যেখানে জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলন থাকবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পূর্বশর্ত হচ্ছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। সে কারণেই আমরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশাসন পরিচালনার মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করেছি। আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে বাসত্মব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এর সুফল জনগণ পেতে শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে ভোজ্য তেল, চাল, আটা, ময়দা, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য কমে এসেছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বাজার মনিটরিং-এর কার্যক্রম গ্রহণের জন্য আমি জেলা প্রশাসকদের অনুরোধ জানাচ্ছি। সীমিত ও স্বল্প আয়ের লোকদের সুবিধার্থে আমরা ওএমএস-এর মাধ্যমে খোলাবাজারে কম মূল্যে চাল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছি। দেশের দুস্থ ও দরিদ্র জনগণের সুবিধার্থে ভিজিডি ও ভিজিএফ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। এ কর্মসূচির সুফল যাতে দরিদ্র মানুষ পায় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনাদের। বয়স্ক ভাতা, দুস্থ মহিলা ও বিধবা ভাতা ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা গ্রহণের সময় মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয় তা কঠোরভাবে লক্ষ্য রাখবেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নন-ইউরিয়া সারের দাম অর্ধেকে নামিয়ে এনেছি। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম কমানো হয়েছে । এছাড়া, উন্নত বীজ সরবরাহ, সেচ মওসুমে সেচ সুবিধার জন্য গ্রামাঞ্চলকে বিদ্যুৎ-এর লোডশেডিং-এর আওতামুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এর সুফল আমরা ইতোমধ্যেই পেয়েছি। গত বোরো মওসুমে আমরা বাম্পার ফলন পেয়েছি। জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে এ বছর বর্ষা মওসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হচ্ছে না। আপনারা জানেন, এখন আমন ধানের চারা রোপনের সময়। কিন্তু জমিতে পানি না থাকায় কৃষক আমন চারা রোপন করতে পারছে না। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিনা খরচে আমন ক্ষেতে সেচ সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে আপনাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যে টাকা ভর্তুকি দেওয়া হবে, তার যেন কোনভাবেই অপচয় না হয়। প্রকৃত উপকারভোগীরা যাতে সে টাকা পায়। প্রিয় জেলা প্রশাসকবৃন্দ, সরকারের প্রতিনিধি হয়ে আপনাদের মাঠ পর্যায়ে সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডের সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করতে হয়। সকল নির্মাণ কাজের মান নিশ্চিতকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পল্লী উন্নয়ন, যুব উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পসমূহ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে। সরকারের সার্বিক কর্মকান্ডের সুসমন্বয়ের মাধ্যমেই সাফল্য লাভ করা সম্ভব। সমন্বয় কার্যক্রম সম্পাদনে কোনরকম প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা দূর করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ অন্যান্য সকল মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিচ্ছি। জেলা প্রশাসকগণকে তাঁদের আওতাধীন সকল সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন প্রকল্প নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে। এতে করে স্থানীয় পর্যায়ে কাজের গতিশীলতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। কালেক্টর হিসেবে জেলা প্রশাসকদের ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গতিশীলতা আনতে হবে। সরকারি খাস জমি, অর্পিত সম্পত্তি, অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি, পরিত্যক্ত সম্পত্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অ-ব্যবস্থাপনার কারণে মফস্বলে জমিজমা সংক্রান্ত ঝগড়া-বিবাদ সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। এ বিষয়ে আপনাদের এবং আপনাদের সহকর্মীদের আরও যত্নবান হতে হবে। সাধারণ মানুষ যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হয়, মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ে সর্বসান্ত না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আমরা আজ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছি। পাশাপাশি আমাদের নদী-নালা, খালবিল, প্রাকৃতিক জলাভূমি ভূমিদস্যুদের দখলে চলে গেছে বা যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই আপনারা দেখেছেন, ঢাকার আশেপাশের নদীগুলোকে দখলমুক্ত করার কঠোর পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করেছি। অতীতে কী হয়েছে আমি সেদিকে যাব না, কিন্তু আমি আপনাদের কঠোর নির্দেশ দিচ্ছি আমাদের শাসনামলে কেউ যাতে অবৈধভাবে সরকারি জমি, নদী-খাল-বিল জলাভূমি দখল করতে না পারে সেদিকে আপনারা সজাগ দৃষ্টি দিবেন। পরিবেশ বিপর্যয় রোধে জনগণকে সচেতন করতে বেশি করে গাছ লাগানোর পদক্ষেপ নিন। যথাযথ নিয়ম না মেনে ইটের ভাটা তৈরি বন্ধ করা, নদী থেকে অবৈধভাবে বালি বা মাটি উত্তোলন ইত্যাদি বন্ধ করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিন। এক্ষেত্রে প্রচলিত আইনের বাস্তবায়নে আপনাদের আরও কঠোর হতে হবে। আইনের ঘাটতি থাকলে বলুন, আমরা আরও কঠোর আইন তৈরি ক'রব। ভরাট হয়ে যাওয়া খাল-বিল, জলাশয় সম্ভাব্য ক্ষেত্রে পুনঃখনন করে নৌ-চলাচল, মৎস্য চাষ ও সেচের সুবিধা সৃষ্টি করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমি আপনাদের নির্দেশ দিচ্ছি। আপনারা জানেন, জঙ্গিবাদ আমাদের দেশের আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা ফেলেছে। জঙ্গী সংগঠনের অপতৎপরতা রোধের জন্য জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটিগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত মাসিক সভা করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মনিটরিং জোরদার করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের কার্যক্রম সমন্বয়ের ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের সরকার স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করতে চায়। দীর্ঘদিন পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উপজেলা পরিষদ কাজ শুরু করেছে। সংসদে উপজেলা পরিষদ আইন পাশের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। উপজেলা পরিষদ যেন দেশের আপামর জনসাধারণের কল্যাণে কাজে আসতে পারে সে বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। প্রিয় কর্মকর্তাবৃন্দ, জনপ্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তাবৃন্দ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় যাতে কার্যকর অবদান রাখতে পারেন সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমরা বিশ্বাস করি, জনকল্যাণের জন্য শক্তিশালী সুদৃঢ় প্রশাসন অপরিহার্য। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ফলে মাঠ প্রশাসনে যাতে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে সরকার ওয়াকিবহাল। ইতোমধ্যে ফৌজদারী কার্যবিধি, ১৯৯৮ আংশিক সংশোধিত হয়েছে এবং মোবাইল কোর্ট আইন প্রণয়নের কাজও অনেক দূর এগিয়ে গেছে। মাঠ প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তাদের সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনী সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রেও সরকার ওয়াকিবহাল আছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনে আপনাদের যে সকল সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তা দূর করার জন্য আমাদের সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। আপনারা যাতে প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারেন, তার ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি। প্রিয় জেলা প্রশাসকবৃন্দ, জনগণকে সেবা দেওয়া প্রজাতন্ত্রের প্রতিটি কর্মচারির সাংবিধানিক দায়িত্ব। জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব অর্জনে আপনাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ব্যক্তিগত সততার মান বাড়াতে হবে। যোগ্যতাকে আরও শাণিত করতে হবে। আমরা চাই না, সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর ধরে দরিদ্র থাকুক। আপনাদের লক্ষ্য হবে দেশ থেকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য দূর করা। সুশাসন কায়েম করা। অর্পিত দায়িত্ব পালনে আপনারা শতভাগ সফল হোন এই আশাবাদ ব্যক্ত করে আমি জেলা প্রশাসক সম্মেলন¾২০০৯-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। খোদা হাফেজ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। ...... |