|
জাতীয় যুব দিবস-২০১১, উদ্বোধন অনুষ্ঠান
ভাষণ
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা
ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, ঢাকা, সোমবার, ০৩ মাঘ ১৪১৮, ১৬ জানুয়ারি ২০১২
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সহকর্মীবৃন্দ, সংসদ সদস্যগণ, উপস্থিত সুধিবৃন্দ, যুব ভাই ও বোনেরা।
আসসালামু আলাইকুম।
জাতীয় যুবদিবস-২০১১ এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সবাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। যুব সমাজ আমাদের গর্ব। এদেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে যুব সমাজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। বৃটিশ ঔপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলন, ৫২'র ভাষা আন্দোলন, ৬২'র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬'র ছয়-দফা সংগ্রাম, ৬৯'র গণঅভ্যূত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে যুবসমাজ আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাদের এই আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে। সুধিমন্ডলী, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলতেন ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই'। এই সোনার মানুষই হল যুবসমাজ। দেশের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ যুবক ও যুব মহিলা। এই বিশাল যুবসমাজের শক্তি, উদ্যম, সাহস আর কর্মস্পৃহা আমাদের দেশকে আরও উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। আমরা এবার সরকার গঠনের পর যুবকদের শ্রম ও মেধার যথাযথ ব্যবহারের দিকে নজর দিয়েছি। এ পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ বেকার যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাদের আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা যখন ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করি তখন দেশের যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর খুবই বেহাল দশা ছিল। আমরা সে অবস্থার উত্তরণ ঘটাই। সাভার যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৫০টি ট্রেডে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা নেই। কর্মসংস্থান ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করি। কোন জামানত ছাড়াই বেকার যুবকদের ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করি। এবার এই পরিমাণ ১ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। দেশের যুবসমাজকে লক্ষ্য রেখেই আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলাম। দেশের প্রতিটি এলাকা আজ যোগাযোগ প্রযুক্তির নেটওয়ার্কে এসেছে। দেশের ৬৪ টি জেলা ও ৪৭৬ টি উপজেলায় যুব উন্নয়ন কার্যালয়ে ইন্টারনেট সার্ভিস স্থাপন করা হয়েছে। ৪ হাজার ৫০১ টি ইউনিয়নে ই-তথ্য ও সেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ প্রতি মাসে এসব কেন্দ্র থেকে সেবা পাচ্ছেন। নতুন নতুন উদ্যেক্তা সৃষ্টি হচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে কর্মসংস্থান। সরকার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশব্যাপী উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ ও ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আত্মকর্মী যুবকদের মধ্যে ১৮২ কোটি টাকার ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির সহায়তা ১ লাখ ১ হাজার ১৮৬ জন যুবককে পরিবার ভিত্তিক ঋণ ও আত্মকর্মসংস্থান ঋণ প্রদান করা হয়েছে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৩২৩ কোটি টাকা। ন্যাশনাল কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রাম, বরগুণা ও গোপালগঞ্জ জেলার ৫৫ হাজার ২৫৪ জন যুবক ও যুবমহিলা অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে। এ কর্মসূচি রংপুর বিভাগের ৭টি জেলার আরও ৮টি উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সমবায়ের ভিত্তিতে উন্নত কৃষি খামার এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে আমরা যুবসমাজকে উৎসাহিত করছি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো এস এম ই খাতে ঋণ দিচ্ছে। মেয়েদের জন্যও বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য আমরা যুবকদের প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করছি। এ জন্য দেশে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটানো হয়েছে। সুধিমন্ডলী, যুব সমাজ যাতে ভূল পথে পা না বাড়ায়, মাদকাসক্ত বা সমাজবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত হয়ে না পড়ে সেদিকে আমাদের সকলেরই দৃষ্টি রাখতে হবে। কোন কোন স্বার্থান্বেষী মহল যুবদেরকে ঘৃণ্য সন্ত্রাসী, জঙ্গি কর্মকান্ডে যুক্ত করে থাকে। এ সমস্ত অপতৎপরতার বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে সজাগ থাকতে হবে। আমাদের সাংস্কৃতির ঐতিহ্য, জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস যুব সমাজকে জানাতে হবে। আমাদের হাজার বছরের পারিবারিক বন্ধন, মূল্যবোধ সমন্ধে সম্যক ধারণা দিতে হবে। বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও আমরা আন্তরিকতার সাথে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান হয়েছে। শুধু সরকারি খাতেই সাড়ে চার লক্ষাধিক নারী-পুরুষ চাকুরি পেয়েছেন। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী আত্মকর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পেয়েছে। মাথাপিছু আয় ৮২৮ ডলারে উন্নীত হয়েছে। দেশে বিনিয়োগ বেড়েছে। উৎপাদন বেড়েছে। রেমিটেন্স আয় ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সরকার গঠনের সময় যা ছিল ৯.২ বিলিয়ন। ৬.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। আমরা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বহুগুণে বাড়িয়েছি। বিদ্যুৎ, শিক্ষা, কৃষি, যোগাযোগ, শিল্প, সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। প্রিয় যুব ভাই ও বোনেরা, জাতির পিতা একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা মুক্ত সুখী ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। দেশ গড়ার এ মহান কাজটি তিনি যুবদের দ্বারাই সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন। আমরা জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে চাই। আমরা যুদ্ধ করে বিজয় এনেছি। আমরা দারিদ্র্য, নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হবই। শুধু চাকুরীর প্রত্যাশায় অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে না থেকে তোমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা কর। দেখবে তোমরাই অনেককে চাকুরি দিতে পেরেছ। তোমরা দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা কাজে লাগিয়ে আত্মকর্মসংস্থানে এগিয়ে আস। প্রতিটি যুবকের হাত কর্মীর হাতিয়ারে পরিণত কর। তোমরাই দেশকে পাল্টে দিতে পারবে। স্মরণ রাখবে তোমাদের কেউ যেন বিপথে ঠেলে দিতে না পারে। দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে। আজ যে সকল সফল আত্মকর্মী যুবক ও যুবমহিলা এবং যুব সংগঠন আত্মকর্মসংস্থানে দৃষ্টান্তমূলক অবদান রাখার জন্য পুরস্কার পেয়েছে, তাদেরকে আমি অভিনন্দন জানাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তোমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এ বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। সবাইকে আবারও ধন্যবাদ জানিয়ে, আমি জাতীয় যুবদিবস ২০১১ এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।
খোদা হাফেজ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। ... |