
প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয় লাইব্রেরি
প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয়, তেজগাঁও, ঢাকা
স্বত্বমুক্ত
বাংলা বই
একটি পরীক্ষামূলক
কার্যক্রম
ত্রয়োদশ
পরিচ্ছেদ
পিতার মৃত্যুর
পর ছয় মাস ধরিয়া
ক্রমাগত বাটীতে
থাকিয়া, দেবদাস একেবারে
জ্বালাতন হইয়া
উঠিল। সুখ
নাই, শান্তি নাই, একান্ত একঘেয়ে
জীবন। তার
উপর ক্রমাগত পার্বতীর
চিন্তা; আজকাল সব কাজেই
তাহাকে মনে পড়ে। আর, ভাই দ্বিজদাস
এবং পতিব্রতা ভাতৃজায়া
দেবদাসের জ্বালা
আরও বাড়াইয়া
তুলিলেন।
গৃহিণীর অবস্থাও
দেবদাসের ন্যায়। স্বামীর মৃত্যুর
সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর
সমস্ত সুখই ফুরাইয়া
গিয়াছে। পরাধীনভাবে এ
বাড়ি তাঁহার ক্রমে
অসহ্য হইয়া উঠিতেছে। আজ কয়দিন হইতে
তিনি কাশীবাসের
সঙ্কল্প করিতেছেন; শুধু দেবদাসের
বিবাহ না দিয়া
যাইতে পারিতেছেন
না। বলিতেছেন-দেবদাস, একটি বিয়ে
কর-আমি দেখে যাই। কিন্তু তাহা কিরূপে
সম্ভব? একে অশৌচ অবস্থা, তার উপর আবার
মনোমত পাত্রীর
সন্ধান করিতে হইবে। আজকাল তাই গৃহিণীর
মাঝে মাঝে দুঃখ
হয় যে, সে-সময় পার্বতীর
সহিত বিবাহ দিলেই
বেশ হইত। একদিন তিনি দেবদাসকে
ডাকিয়া কহিলেন, দেবদাস, আর ত পারিনে-দিনকতক
কাশী গেলে হয়। দেবদাসেরও
তাই ইচ্ছা, কহিল, আমিও তাই বলি। ছয় মাস পরে ফিরে
এলেই হবে।
হাঁ বাবা, তাই কর। শেষে ফিরে এসে, তাঁর কাজ হয়ে
গেলে, তোর বিয়ে দিয়ে
তোকে সংসারী দেখে
আমি কাশীবাস করব।
দেবদাস স্বীকৃত
হইয়া, জননীকে কিছুদিনের
জন্য কাশীতে রাখিয়া
আসিয়া, কলিকাতায়
চলিয়া গেল। কলিকাতায় আসিয়া
তিন-চারদিন ধরিয়া
দেবদাস চুনিলালের
সন্ধান করিল। সে নাই, বাসা পরিবর্তন
করিয়া কোথায়
চলিয়া গিয়াছে। একদিন সন্ধ্যার
সময় দেবদাস চন্দ্রমুখীর
কথা স্মরণ করিল। একবার দেখা করিলে
হয় না? এতদিন তাহাকে
মোটেই মনে পড়ে
নাই। দেবদাসের যেন
একটু লজ্জা করিল, একটা গাড়ি
ভাড়া করিয়া সন্ধ্যার
কিছু পরেই চন্দ্রমুখীর
বাটীর সম্মুখে
আসিয়া উপস্থিত
হইল। বহুক্ষণ ডাকাডাকির
পর ভিতর হইতে স্ত্রীকণ্ঠে
উত্তর আসিল,-এখানে নয়।
সম্মুখে একটা
গ্যাসপোস্ট ছিল, দেবদাস তাহার
নিকটে সরিয়া আসিয়া
কহিল, বলতে পার সে স্ত্রীলোকটি
কোথায় গেছে?
জানালা খুলিয়া
কিছুক্ষণ সে চাহিয়া
কহিল, তুমি কি দেবদাস?
হাঁ।
দাঁড়াও, দোর খুলে দিই।
দ্বার খুলিয়া
সে কহিল, এস-
কণ্ঠস্বর যেন
কতকটা পরিচিত, অথচ ভাল চিনিতে
পারিল না। একটু অন্ধকারও
হইয়াছিল। সন্দেহে
কহিল, চন্দ্রমুখী কোথায়
বলতে পার?
স্ত্রীলোকটি
মৃদু হাসিয়া কহিল, পারি; ওপরে চল।
এবার দেবদাস
চিনিতে পারিল-অ্যাঁ, তুমি?
হাঁ আমি। দেবদাস, আমাকে একেবারে
ভুলে গেলে?
উপরে গিয়া
দেবদাস দেখিল, চন্দ্রমুখীর
পরনে কালাপেড়ে
ধুতি, কিন্তু মলিন। হাতে শুধু দু'গাছি বালা, অন্য অলঙ্কার
নাই। মাথার চুল
এলোমেলো। বিস্মিত হইয়া
বলিল, তুমি? ভাল করিয়া
চাহিয়া দেখিল, চন্দ্রমুখী
পূর্বাপেক্ষা
অনেক কৃশ হইয়াছে। কহিল, তোমার অসুখ
হয়েছিল?
চন্দ্রমুখী
হাসিয়া কহিল, শারীরিক একটুও
নয়। তুমি ভাল করে
বোস।
দেবদাস শয্যায়
উপবেশন করিয়া
দেখিল, ঘরটির একেবারে
আগাগোড়া পরিবর্তন
হইয়াছে। গৃহস্বামিনীর
মত তাহারও দুর্দশার
সীমা নাই। একটিও আসবাব নাই-
আলমারি, টেবিল, চেয়ারের
স্থান শূন্য পড়িয়া
আছে। শুধু একটি
শয্যা; চাদর অপরিষ্কৃত, দেয়ালের গায়ে
ছবিগুলি সরাইয়া
ফেলা হইয়াছে, লোহার কাটী
এখনো পোঁতা আছে, দুই-একটায়
লাল ফিতা এখনও
ঝুলিতেছে। উপরের সেই ঘড়িটা
এখনো ব্রাকেটের
উপর আছে, কিন্তু নিঃশব্দ। আশেপাশে
মাকড়সা মনের মত
করিয়া জাল বুনিয়া
রাখিয়াছে। এক কোণে একটা তৈলদীপ
মৃদু আলোক বিতরণ
করিতেছে-তাহারই
সাহায্যে দেবদাস
নূতন ধরনের গৃহসজ্জা
দেখিয়া লইল। কিছু বিস্মিত, কিছু ক্ষুব্ধ
হইয়া কহিল, চন্দ্র, এমন দুর্দশা
কেমন করে হল?
চন্দ্রমুখী
ম্লান-হাসি হাসিয়া
কহিল, দুর্দশা তোমাকে
কে বললে? আমার ত ভাগ্য
খুলেচে।
দেবদাস বুঝিতে
পারিল না; কহিল, তোমার গায়ের
গয়নাই বা গেল
কোথায়?
বেচে ফেলেচি।
আসবাবপত্র?
তাও বেচেচি।
ঘরের ছবিগুলোও
বিক্রি করেচ?
এবার চন্দ্রমুখী
হাসিয়া সম্মুখের
একটা বাড়ি দেখাইয়া
কহিল, ও বাড়ির ক্ষেত্রমণিকে
বিলিয়ে দিয়েচি।
দেবদাস কিছুক্ষণ
মুখপানে চাহিয়া
থাকিয়া কহিল, চুনিবাবু কোথায়?
বলতে পারিনে। মাস-দুই হল ঝগড়া
করে চলে গেছে, আর আসেনি।
দেবদাস আরও
আশ্চর্য হইল-ঝগড়া
কেন?
চন্দ্রমুখী
কহিল, ঝগড়া কি হয় না?
হয়। কিন্তু কেন?
দালালি করতে
এসেছিল, তাই তাড়িয়ে
দিয়েছিলুম।
কিসের দালালি?
চন্দ্রমুখী
হাসিয়া বলিল, পাটের। তার পর কহিল, তুমি বুঝতে
পার না কেন? একজন বড়লোক
ধরে এনেছিল, মাসে দু শ' টাকা, একরাশ অলঙ্কার, আর দরজার সুমুখে
এক সেপাই। বুঝলে?
দেবদাস বুঝিয়া
হাসিয়া কহিল, কৈ, সে-সকল ত দেখিনে?
থাকলে ত দেখবে। আমি তাঁদের তাড়িয়ে
দিয়েছিলাম।
তাদের অপরাধ?
অপরাধ বেশী
কিছু ছিল না, কিন্তু আমার
ভাল লাগল না।
দেবদাস বহুক্ষণ
ধরিয়া ভাবিয়া
বলিল, সেই পর্যন্ত আর
কেউ এখানে আসেনি?
না। সেই
পর্যন্ত কেন, তুমি যাবার
পরদিন থেকেই এখানে
কেউ আসে না। শুধু চুনি মাঝে
মাঝে এসে বসত, কিন্তু মাস-দুই
থেকে তাও বন্ধ।
দেবদাস বিছানার
উপর শুইয়া পড়িল। অন্যমনস্কভাবে
বহুক্ষণ মৌন থাকিয়া
ধীরে কহিল, চন্দ্রমুখী, তবে দোকানপাট
সব তুলে দিলে? হাঁ-দেউলে
হয়ে পড়েচি।
দেবদাস সে
কথার উত্তর না
দিয়া বলিল, কিন্তু খাবে
কি করে?
এই যে শুনলে
কিছু গহনাপত্র
ছিল, বিক্রি করেচি।
সে আর কত?
বেশী নয়। প্রায় আট-ন' শ টাকা আমার
আছে। একজন মুদীর
কাছে রেখে দিয়েচি-সে
আমাকে মাসে কুড়ি
টাকা দেয়।
কুড়ি টাকায়
আগে ত তোমার চলত
না?
না, আজও ভাল চলে
না। তিন মাসের
বাড়িভাড়া বাকী, তাই মনে করচি, হাতের এই দু'গাছা বালা
বিক্রি করে, সমস্ত পরিশোধ
করে দিয়ে আর কোথাও
চলে যাব।
কোথায় যাবে?
তা এখনো স্থির
করিনি। কোন
সস্তা মুলুকে যাব-কোন
পাড়াগ্রামে-যেখানে
কুড়ি টাকায় মাস
চলে।
এতদিন যাওনি
কেন? যদি সত্যই তোমার
আর-কিছু প্রয়োজন
নেই ত এতদিন মিথ্যা
কেন ধার-কর্জ বাড়ালে?
চন্দ্রমুখী
নতমুখে কিছুক্ষণ
ভাবিয়া লইল। তাহার জীবনে এ
কথাটা বলিতে আজ
তাহার প্রথম লজ্জা
করিল। দেবদাস
বলিল, চুপ করলে যে?
চন্দ্রমুখী
শয্যার একপ্রান্তে
সঙ্কুচিতভাবে
উপবেশন করিয়া
ধীরে ধীরে কহিল, রাগ করো না; যাবার আগে
আশা করেছিলাম, তোমার সঙ্গে
দেখা হলে ভাল হয়। ভাবতাম, তুমি হয়ত
আর-একবার আসবে। আজ তুমি এসেচ, এখন কালই যাবার
উদ্যোগ করব। কিন্তু কোথায়
যাই বলে দেবে?
দেবদাস বিস্মিত
হইয়া উঠিয়া বসিল; কহিল, শুধু আমাকে
দেখবার আশায়? কিন্তু কেন?
একটা খেয়াল। তুমি আমাকে বড়
ঘৃণা করতে। এত ঘৃণা কেউ কখনো
করেনি বোধ হয়, তাই। আজ তোমার
মনে পড়বে কিনা
জানিনে, কিন্তু আমার
বেশ মনে আছে,-যেদিন তুমি
এখানে প্রথম এলে, সেইদিন থেকেই
তোমার উপর আমার
দৃষ্টি পড়েছিল। তুমি ধনীর সন্তান
তা জানতাম; কিন্তু ধনের
আশায় তোমার পানে
আকৃষ্ট হইনি। তোমার পূর্বে
কত লোক এখানে এসেচে
গেছে, কিন্তু কারো ভিতরে
কখনো তেজ দেখিনি। আর তুমি এসেই আমাকে
আঘাত করলে; একটা অযাচিত, উপযুক্ত অথচ
অনুচিত রূঢ় ব্যবহার। ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে
রইলে, শেষে তামাশার
মত কিছু দিয়ে
গেলে। এ-সব
মনে পড়ে কি?
দেবদাস চুপ
করিয়া রহিল। চন্দ্রমুখী পুনরায়
কহিতে লাগিল, সেই অবধি তোমার
প্রতি দৃষ্টি রাখলাম। ভালবেসে নয়, ঘৃণা করেও
নয়। একটা নূতন
জিনিস দেখলে যেমন
তা খুব মনে থাকে, তোমাকেও তাই
কিছুতেই ভুলতে
পারিনি-তুমি এলে
বড় ভয়ে ভয়ে
সতর্ক হয়ে থাকতাম, কিন্তু না
এলে কিছুই ভাল
লাগত না। তার পর আবার কি
যে মতিভ্রম ঘটল-এই
দুটো চোখে অনেক
জিনিসই আর-এক রকম
দেখতে লাগলাম। পূর্বের 'আমি'র সঙ্গে এমন
করে বদলে গেলাম-যেন
সে 'আমি' আর নয়। তার পরে তুমি মদ
ধরলে। মদে
আমার বড় ঘৃণা। কেউ মাতাল হলে
তার ওপর বড় রাগ
হত। কিন্তু তুমি
মাতাল হলে রাগ
হত না, কিন্তু বড্ড দুঃখ
পেতাম।-বলিয়া
চন্দ্রমুখী দেবদাসের
পায়ের উপর হাত
রাখিয়া ছলছলচক্ষে
কহিল, আমি বড় অধম, আমার অপরাধ
নিয়ো না। তুমি যে কত কথা
কইতে, কতবড় ঘৃণায়
সরিয়ে দিতে; আমি কিন্তু
তোমার তত কাছে
যেতে চাইতাম। শেষে ঘুমিয়ে
পড়লে-থাক্ সে-সব
বলব না, হয়ত আবার
রাগ করে বসবে।
দেবদাস কিছুই
কহিল না-নূতন ধরনের
কথাবার্তা তাহাকে
কিছু কেশ দিতেছিল। চন্দ্রমুখী
গোপনে চক্ষু মুছিয়া
কহিতে লাগিল, একদিন তুমি
বললে-আমরা কত সহ্য
করি। লাঞ্ছনা, অপমান-জঘন্য
অত্যাচার, উপদ্রবের কথা-সেইদিন
থেকেই বড় অভিমান
হয়েচে- আমি সব
বন্ধ করে দিয়েচি।
দেবদাস উঠিয়া
বসিয়া জিজ্ঞাসা
করিল, কিন্তু দিন চলবে
কি করে?
চন্দ্রমুখী
কহিল, সে ত আগেই বলেচি।
মনে কর, সে যদি তোমার
সমস্ত টাকা ফাঁকি
দেয়-
চন্দ্রমুখী
ভয় পাইল না। শান্ত সহজভাবে
কহিল, আশ্চর্য নয়, কিন্তু তাও
ভেবেচি। বিপদে
পড়লে তোমার কাছে
কিছু ভিক্ষা চেয়ে
নেব।
দেবদাস ভাবিয়া
কহিল, তাই নিয়ো। এখন আর কোথাও যাবার
উদ্যোগ কর।
কালই করব। বালা দু'গাছা বেচে, একবার মুদীর
সঙ্গে দেখা করব।
দেবদাস পকেট
হইতে পাঁচখানা
একশত টাকার নোট
বাহির করিয়া বালিশের
তলে রাখিয়া কহিল,-বালা বিক্রি
করো না, তবে মুদীর
সঙ্গে দেখা করো। কিন্তু যাবে কোথায়? কোন তীর্থস্থানে?
না দেবদাস!
তীর্থধর্মের উপর
আমার তত আস্থা
নেই। কলকাতা থেকে
বেশী দূরে যাব
না, কাছাকাছি
কোন গ্রামে গিয়ে
থাকব। কোন
ভদ্র-পরিবারে কি
দাসীবৃত্তি করবে?
চন্দ্রমুখীর
চোখে আবার জল আসিল। মুছিয়া কহিল, প্রবৃত্তি
হয় না। স্বাধীনভাবে
স্বচ্ছন্দে থাকব। কেন দুঃখ করতে
যাব? শরীরের দুঃখ কোনদিন
সইনি, এখনো সইতে পারব
না। আর
বেশী টানাটানি
করলে হয়ত ছিঁড়ে
যাবে।
দেবদাস বিষন্নমুখে
ঈষৎ হাসিল; কহিল, কিন্তু শহরের
কাছে থাকলে আবার
হয়ত প্রলোভনে
পড়বে-মানুষের
মনকে বিশ্বাস নেই।
এবার চন্দ্রমুখীর
মুখ প্রফুল্ল হইল। হাসিয়া কহিল, সে কথা সত্যি, মানুষের মনকে
বিশ্বাস নেই বটে, কিন্তু আমি
আর প্রলোভনে পড়ব
না। স্ত্রীলোকের
লোভ বড় বেশী তাও
মানি, কিন্তু যা-কিছু
লোভের জিনিস যখন
ইচ্ছে করেই ত্যাগ
করচি তখন আর আমার
ভয় নেই। হঠাৎ
যদি ঝোঁকের ওপর
ছাড়তাম, তাহলে হয়ত
সাবধান হবার আবশ্যক
ছিল, কিন্তু এতদিনের
মধ্যে একটা দিনও
ত আমাকে অনুতাপ
করতে হয়নি। আমি যে বেশ সুখে
আছি।
তথাপি দেবদাস
মাথা নাড়িল; কহিল, স্ত্রীলোকের
মন বড় চঞ্চল-বড়
অবিশ্বাসী।
এবার চন্দ্রমুখী
একেবারে কাছে আসিয়া
বসিল। হাত
ধরিয়া কহিল, দেবদাস!
দেবদাস তাহার
মুখপানে চাহিল, এখন আর বলিতে
পারিল না-আমাকে
স্পর্শ করো না।
চন্দ্রমুখী
স্নেহ-বিস্ফারিত
চক্ষে, ঈষৎ কম্পিতকণ্ঠে, তাহার হাত-দুটি
নিজের কোলের উপর
টানিয়া লইয়া
কহিল, আজ শেষ দিন, আজ আর রাগ করো
না। একটা কথা তোমাকে
জিজ্ঞাসা করবার
বড় সাধ হয়।-বলিয়া সে ক্ষণকাল
স্থিরদৃষ্টিতে
দেবদাসের মুখের
পানে চাহিয়া থাকিয়া
কহিল, পার্বতী তোমাকে
কি বড় বেশী আঘাত
করেচে?
দেবদাস ভ্রূকুটি
করিল, বলিল, এ কথা কেন?
চন্দ্রমুখী
বিচলিত হইল না। শান্ত দৃঢ়স্বরে
বলিল, আমার কাজ আছে। তোমাকে সত্যি
বলচি, তুমি দুঃখ পেলে
আমারও বড় বাজে। তা ছাড়া আমি বোধ
হয় অনেক কথাই
জানি। মাঝে
মাঝে নেশার ঘোরে
তোমার মুখ থেকে
অনেক কথাই শুনেচি। কিন্তু তবুও আমার
বিশ্বাস হয় না
যে, পার্বতী তোমাকে
ঠকিয়েচে। বরঞ্চ মনে হয়, তুমি নিজেই
নিজেকে ঠকিয়েচ। দেবদাস, আমি তোমার
চেয়ে বয়সে বড়, এ সংসারে অনেক
জিনিস দেখেচি। আমার কি মনে হয়
জান? নিশ্চয় মনে হয়, তোমারই ভুল
হয়েচে। মনে হয়, চঞ্চল এবং
অস্থিরচিত্ত বলে
স্ত্রীলোকের যত
অখ্যাতি, ততখানি অখ্যাতির
তারা যোগ্য নয়। অখ্যাতি করতেও
তোমরা, সুখ্যাতি
করতেও তোমরা। তোমাদের যা বলবার-অনায়াসে
বল, কিন্তু তারা তা
পারে না। নিজের
মনের কথা প্রকাশ
করতে পারে না; পারলেও তা
সবাই বোঝে না। কেননা, বড় অস্পষ্ট
হয়-তোমাদের মুখের
কাছে চাপা পড়ে
যায়। তার
পরে অখ্যাতিটাই
লোকের মুখে মুখে
স্পষ্টতর হয়ে
ওঠে।
চন্দ্রমুখী
একটু থামিয়া, কণ্ঠস্বর আরও
একটু পরিষ্কার
করিয়া বলিতে লাগিল, এ জীবনে ভালবাসার
ব্যবসা অনেকদিন
করেচি, কিন্তু একটিবারমাত্র
ভালবেসেচি। সে ভালবাসার অনেক
মূল্য। অনেক
শিখেচি, জান ত ভালবাসা
এক, আর রূপের মোহ আর। এ দু'য়ে বড় গোল বাধে, আর পুরুষেই
বেশী গোল বাধায়। রূপের মোহটা তোমাদের
চেয়ে আমাদের নাকি
অনেক কম, তাই একদণ্ডেই
আমরা তোমাদের মত
উন্মত্ত হয়ে উঠিনে। তোমরা এসে যখন
ভালবাসা জানাও, কত কথায়, কত ভাবে যখন
প্রকাশ কর, আমরা চুপ করে
থাকি। অনেক
সময় তোমাদের মনে
কেশ দিতে লজ্জা
করে, দুঃখ হয়, সঙ্কোচ বাধে। মুখ দেখতেও যখন
ঘৃণা বোধ হয়, তখনও হয়ত
লজ্জায় বলতে পারিনে-আমি
তোমাকে ভালবাসতে
পারব না। তার পরে একটা বাহ্যিক
প্রণয়ের অভিনয়
চলে; একদিন, যখন তা শেষ
হয়ে যায়, পুরুষমানুষ
রেগে অস্থির হয়ে
বলে, কি বিশ্বাসঘাতক!
সবাই সেই কথা শোনে, সেই কথাই বোঝে। আমরা তখনও চুপ
করে থাকি। মনে কত কেশ হয়, কিন্তু কে
তা দেখতে যায়?
দেবদাস কোন
কথা কহিল না। সেও কিছুক্ষণ
নিঃশব্দে মুখপানে
চাহিয়া থাকিয়া
বলিল, হয়ত একটা মমতা
জন্মায়; স্ত্রীলোক
মনে করে এই বুঝি
ভালবাসা! শান্ত
ধীরভাবে সংসারের
কাজকর্ম করে, দুঃখের সময়
প্রাণপণে সাহায্য
করে, তোমরা কত সুখ্যাতি
কর,-মুখে মুখে তার
কত ধন্য ধন্য! কিন্তু
হয়ত তখনো তার
ভালবাসার বর্ণপরিচয়
হয় না। তার
পরে যদি কোন অশুভ
মুহূর্তে তাহার
বুকের ভেতরটা অসহ্য
বেদনায় ছটফট করে
বেরিয়ে এসে দাঁড়ায়, তখন-বলিয়া
সে দেবদাসের মুখের
পানে তীব্র দৃষ্টিপাত
করিয়া কহিল, তখন তোমরা
চিৎকার করে বলে
ওঠো-কলঙ্কিনী!
ছিঃ ছিঃ!
অকস্মাৎ দেবদাস
চন্দ্রমুখীর মুখে
হাত চাপা দিয়া
বলিয়া উঠিল-চন্দ্রমুখী, ও কি!
চন্দ্রমুখী
ধীরে ধীরে হাত
সরাইয়া দিয়া
কহিল, ভয় নেই দেবদাস, আমি তোমার
পার্বতীর কথা বলচি
নে। বলিয়া সে
মৌন হইল।
দেবদাসও কিছুক্ষণ
চুপ করিয়া থাকিয়া
অন্যমনস্কের মত
কহিল, কিন্তু কর্তব্য
আছে ত! ধর্মাধর্ম
আছে ত!
চন্দ্রমুখী
বলিল, তা ত আছেই। আর আছে বলেই, দেবদাস, যে যথার্থ
ভালবাসে, সে সহ্য করে
থাকে। শুধু
অন্তরে ভালবেসেও
যে কত সুখ, কত তৃপ্তি-যে
টের পায়, সে নিরর্থক
সংসারের মাঝে দুঃখ-অশান্তি
আনতে চায় না। কিন্তু কি বলছিলাম
দেবদাস,-আমি নিশ্চয়
জানি, পার্বতী তোমাকে
একবিন্দুও ঠকায়নি, তুমি আপনাকেই
ঠকিয়েচ। আজ এ কথা বোঝবার
তোমার সাধ্য নেই
আমি জানি; কিন্তু যদি
কখনো সময় আসে, তখন হয়ত দেখতে
পাবে আমি সত্য
কথাই বলেছিলাম।
দেবদাসের দু'চক্ষু জলে
ভরিয়া উঠিল। আজ কেমন করিয়া
তাহার যেন মনে
হইতে লাগিল, চন্দ্রমুখীর
কথাই সত্য। এই চোখের জল চন্দ্রমুখী
দেখিতে পাইল, কিন্তু মুছাইবার
চেষ্টা করিল না। মনে মনে বলিতে
লাগিল, তোমাকে আমি
অনেকবার অনেক রকমে
দেখেচি, আমি তোমার
মন জানি। বেশ বুঝেচি, সাধারণ পুরুষের
মত তুমি সেধে ভালবাসা
জানাতে পারবে না। তবে
রূপের কথা-রূপ
কে না ভালবাসে? কিন্তু তাই
বলেই যে তোমার
অতখানি তেজ রূপের
পায়ে আত্মবিসর্জন
করে ফেলবে, সে কথা কিছুতেই
বিশ্বাস হয় না। পার্বতী হয়ত
খুব রূপবতী; কিন্তু, তবে মনে হয়, সে-ই তোমাকে
আগে ভালবেসেছিল, আগে সে কথা
জানিয়েছিল। মনে মনে বলিতে
বলিতে সহসা তাহার
মুখ দিয়া অস্ফুটে
বাহির হইয়া পড়িল, নিজেকে দিয়েই
বুঝেচি, সে তোমাকে
কত ভালবাসে!
দেবদাস তাড়াতাড়ি
উঠিয়া বসিয়া
কহিল, কি বললে? চন্দ্রমুখী
কহিল, কিছু না। বলছিলাম
যে সে তোমার রূপে
ভোলেনি। তোমার রূপ আছে
বটে, কিন্তু তাতে ভুল
হয় না। এই তীব্র
রুক্ষ রূপ সকলের
চোখেও পড়ে না। কিন্তু যার পড়ে, সে আর চোখ ফিরুতে
পারে না।-বলিয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস
ফেলিয়া বলিল, তুমি যে কি
আকর্ষণ, তা যে কখন তোমাকে
ভালবেসেছ সে জানে। এই স্বর্গ থেকে
সাধ করে ফিরে যাবে, এমন মেয়েমানুষ
কি পৃথিবীতে আছে?
আবার কিছুক্ষণ
নীরবে তাহার মুখপানে
চাহিয়া থাকিয়া
মৃদু মৃদৃ বলিতে
লাগিল,-এ রূপ ত চোখে
পড়ে না! বুকের
একেবারে মাঝখানটিতে
এর গভীর ছায়া
পড়ে। তার
পরে দিন শেষ হলে
আগুনের সঙ্গে চিতায়
ছাই হয়ে যায়।
দেবদাস বিহ্বল
দৃষ্টিতে চন্দ্রমুখীর
মুখপানে চাহিয়া
কহিল, আজ এ-সব তুমি কি
বলচ?
চন্দ্রমুখী
মৃদু হাসিয়া বলিল, এমন বিপদ আর
নেই দেবদাস, যাকে ভালবাসি
না, সে যদি জোর করে
ভালবাসার কথা শোনায়!
কিন্তু আমি শুধু
পার্বতীর জন্য
ওকালতি করছিলাম-নিজের
জন্য নয়।
দেবদাস উঠিতে
উদ্যত হইয়া বলিল, এবার আমি যাই।
আর একটু বসো। কখনো তোমাকে সজ্ঞানে
পাইনি, কখনো এমন করে
হাত-দুটি ধরে কথা
বলতে পাইনি-এ কি
তৃপ্তি! বলিয়াই
হঠাৎ হাসিয়া উঠিল।
দেবদাস আশ্চর্য
হইয়া কহিল, হাসলে যে?
ও কিছুই নয়, শুধু একটা
পুরনো কথা মনে
পড়ে গেল। সে আজ দশ বছরের
কথা-যখন আমি ভালবেসে
ঘর ছেড়ে চলে আসি। তখন মনে হতো কত
না ভালবাসি, বুঝি প্রাণটাও
দিতে পারি। তারপর
একদিন তুচ্ছ একটা
গয়না নিয়ে দু'জনের এমনি
ঝগড়া হয়ে গেল
যে, আর কখন কেউ কারো
মুখ দেখলাম না। মনকে সান্ত্বনা
দিলাম, সে আমাকে মোটেই
ভালবাসত না,-নাহলে একটা
গয়না দেয় না!
আর একবার চন্দ্রমুখী
নিজের মনে হাসিয়া
উঠিল। পরক্ষণেই
শান্ত গম্ভীরমুখে
মৃদু মৃদু কহিল-ছাই
গয়না! তখন কি জানতাম
একটু সামান্য মাথাধরা
সারাবার জন্যেও
অকাতরে এই প্রাণটা
পর্যন্ত দেওয়া
যায়! তখন না বুঝতাম
সীতা-দময়ন্তীর
ব্যথা, না বিশ্বাস
করতাম জগাই-মাধাইয়ের
কথা। আচ্ছা দেবদাস, এ জগতে সকলই
সম্ভব, না?
দেবদাস কিছুই
বলিতে পারিল না; হতবুদ্ধির
মত ফ্যালফ্যাল
করিয়া কিছুক্ষণ
চাহিয়া থাকিয়া
বলিল, আমি যাই-
ভয় কি, আরো একটু বসো। আমি তোমাকে আর
ভুলিয়ে রাখতে
চাইনে-সেদিন আমার
কেটে গেছে। এখন
তুমিও আমাকে যতখানি
ঘৃণা কর, আমিও আমাকে
ততখানি ঘৃণা করি; কিন্তু দেবদাস
একটা বিয়ে কর
না কেন?
এতক্ষণে দেবদাসের
যেন নিঃশ্বাস পড়িল; একটু হাসিয়া
কহিল, উচিত বটে, কিন্তু প্রবৃত্তি
হয় না।
না হলেও কর। ছেলেমেয়ের মুখ
দেখলেও অনেক শান্তি
পাবে। তা ছাড়া
আমারও একটা উপায়
হয়। তোমার সংসারে
দাসীর মত থেকেও
স্বচ্ছন্দে দিন
কাটাতে পারব।
দেবদাস সহাস্যে
কহিল, আচ্ছা, তখন তোমাকে
ডেকে আনব।
চন্দ্রমুখী
তাহার হাসি যেন
দেখিতেই পাইল না; কহিল, দেবদাস, আর একটা কথা
জিজ্ঞাসা করতে
ইচ্ছা করে।
কি?
তুমি এতক্ষণ
আমার সঙ্গে কথা
কইলে কেন?
কোন দোষ হয়েচে
কি?
তা জানিনে। কিন্তু নতুন বটে!
মদ খেয়ে জ্ঞান
না হারালে, কখন ত পূর্বে
আমার মুখ দেখতে
না!
দেবদাস সে
প্রশ্নের জবাব
না দিয়া বিষণ্নমুখে
কহিল, এখন মদ ছুঁতে নেই-আমার
পিতার মৃত্যু হয়েচে।
চন্দ্রমুখী
বহুক্ষণ করুণচক্ষে
চাহিয়া থাকিয়া
কহিল, এর পরে আর খাবে
কি?
বলতে পারিনে।
চন্দ্রমুখী
তাহার হাত-দুটি
আর একটু টানিয়া
লইয়া অশ্রু-ব্যাকুলস্বরে
কহিল, যদি পার ছেড়ে
দিয়ো, অসময়ে এমন
সোনার প্রাণ নষ্ট
করো না।
দেবদাস সহসা
উঠিয়া দাঁড়াইয়া
বলিল, আমি চললাম। যেখানে যাও, সংবাদ দিয়ো-আর
যদি কখনও কিছু
প্রয়োজন হয়, আমাকে লজ্জা
করো না।
চন্দ্রমুখী
প্রণাম করিয়া
পদধূলি লইয়া বলিল, আশীর্বাদ কর, যেন সুখী হই। আর একটা ভিক্ষা,-ঈশ্বর না করুন, কিন্তু যদি
কখন দাসীর প্রয়োজন
হয়, আমাকে স্মরণ করো।
আচ্ছা।-বলিয়া দেবদাস
চলিয়া গেল। চন্দ্রমুখী যুক্তকরে
কাঁদিয়া বলিল, ভগবান! আর একবার
যেন দেখা হয়।