
প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয়
লাইব্রেরি
প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয়, তেজগাঁও, ঢাকা
স্বত্বমুক্ত বাংলা বই
একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম
তৃতীয়
পরিচ্ছেদ
দিনের পর দিন
যায়-এ দুটি বালক-বালিকার
আমোদের সীমা নাই-সমস্ত
দিন ধরিয়া রোদে
রোদে ঘুরিয়া বেড়ায়, সন্ধ্যার সময়
ফিরিয়া আসিয়া
মারধর খায়, আবার সকালবেলায়
ছুটিয়া পলাইয়া
যায়-আবার তিরস্কার-প্রহার
ভোগ করে। রাত্রে নিশ্চিন্ত-নিরুদ্বেগে
নিদ্রা যায়; আবার সকাল
হয়, আবার
পলাইয়া খেলা করিয়া
বেড়ায়। অন্য সঙ্গীসাথী
বড় কেহ নাই, প্রয়োজনও
হয় না। পাড়াময় অত্যাচার
উপদ্রব করিয়া
বেড়াইতে দুইজনেই
যথেষ্ট। সেদিন সূর্যোদয়ের
কিছু পরেই দুইজনে
বাঁধে গিয়া নামিয়াছিল।
বেলা দ্বিপ্রহরে
চক্ষু রক্তবর্ণ
করিয়া, সমস্ত জল ঘোলা
করিয়া,পনরটা
পুঁটিমাছ ধরিয়া
যোগ্যতা অনুসারে
ভাগ করিয়া লইয়া
বাটী ফিরিয়া আসিল।
পার্বতীর
জননী কন্যাকে রীতিমত
প্রহার করিয়া
ঘরে আবদ্ধ করিয়া
রাখিলেন। দেবদাসের কথা
ঠিক জানি না; কেননা এ-সব
কাহিনী সে কিছুতেই
প্রকাশ করে না।
তবে পার্বতী
যখন বসিয়া খুব
করিয়া কাঁদিতেছিল, তখন-বেলা দুইটা-আড়াইটার
সময়, একবার
জানালার নীচে আসিয়া
অতি মৃদুকণ্ঠে
ডাকিয়াছিল, পারু, ও পারু! পার্বতী
বোধ হয় শুনিতে
পাইয়াছিল, কিন্তু রাগ
করিয়া উত্তর দেয়
নাই। তাহার পর সমস্ত
দিনটা সে অদূরবর্তী
একটা চাঁপাগাছে
বসিয়া কাটাইয়া
দিয়াছিল; এবং সন্ধ্যার
পর বহু পরিশ্রমে
ধর্মদাস তাহাকে
নামাইয়া আনিতে
পারিয়াছিল।
তবে শুধু সেই
দিনটা মাত্র।
পরদিন পার্বতী
সকালবেলা হইতে
দেবদাদার প্রতীক্ষায়
উন্মুখ হইয়া রহিল, কিন্তু দেবদাস
আসিল না-সে পিতার
সহিত নিকটবর্তী
গ্রামে নিমন্ত্রণ
রাখিতে গিয়াছিল।
দেবদাস
যখন আসিল না, পার্বতী তখন
ক্ষুণ্নমনে একাকী
বাটীর বাহির হইয়া
পড়িল। কাল বাঁধে
নামিবার সময় দেবদাস
তিনটা টাকা পার্বতীকে
রাখিতে দিয়াছিল-পাছে
হারাইয়া যায়।
আঁচলে সে
টাকা-তিনটা বাঁধা
ছিল। সে আঁচল ঘুরাইয়া, নিজে ঘুরিয়া
বহুক্ষণ একা কাটাইয়া
দিল। সঙ্গীসাথী কেহ
মিলিল না; কেননা তখন
সকালবেলায় পাঠশালা
বসে। পার্বতী তখন ওপাড়ায়
চলিল। সেখানে মনোরমাদের
বাড়ি। মনোরমা
পাঠশালে পড়ে, বয়সে কিছু
বড়, কিন্তু
পারুর বন্ধু।
অনেকদিন
দেখাশুনা হয় নাই।
আজ সময়
পাইয়া পার্বতী
ওপাড়ায় তাহাদের
বাটীতে প্রবেশ
করিয়া ডাকিল, মনো, বাড়ি
আছিস?
মনোরমার পিসীমা
বাহিরে আসিলেন।
পারু?
হ্যাঁ,-মনো কোথায়
পিসীমা?
সে ত পাঠশালায়
গেছে-তুমি যাওনি?
আমি পাঠশালায়
যাইনি-দেবদাও যায়
না।
মনোরমার পিসীমাতা
হাসিয়া কহিলেন,-তবে ত ভাল! তুমিও
যাও না, দেবদাদাও যায়
না?
না। আমরা কেউ যাইনে।
সে ভাল কথা; কিন্তু মনো
পাঠশালায় গেছে।
পিসীমা বসিতে
বলিলেন, কিন্তু পার্বতী
ফিরিয়া আসিল।
পথে রসিক
পালের দোকানের
কাছে তিনজন বৈষ্ণবী
রসকলি পরিয়া খঞ্জনী-হাতে
ভিক্ষায় চলিয়াছিল, পার্বতী তাহাদিগকে
ডাকিয়া বলিল, ও বোষ্টমী!
তোমরা গান করতে
জান?
একজন ফিরিয়া
চাহিল-জানি বৈ
কি বাছা!
তবে গাও না।
তখন তিনজনেই
ফিরিয়া দাঁড়াইল।
একজন কহিল, অমনি কি গান
হয় মা, ভিক্ষে দিতে হয়। চল, তোমাদের বাড়ি
গিয়ে গা'ব।
না, এইখানে গাও।
পয়সা দিতে
হয় যে মা!
পার্বতী আঁচল
দেখাইয়া কহিল, পয়সা নেই-টাকা
আছে।
আঁচলে বাঁধা
টাকা দেখিয়া তাহারা
দোকান হইতে একটু
দূরে গিয়া বসিল।
তাহার পর
খঞ্জনী বাজাইয়া
তিনজনে গলা মিলাইয়া
গান ধরিল। কি গান হইল, কি তাহার অর্থ-পার্বতী
এ-সব কিছুই বুঝিল
না। ইচ্ছা করিলেও
হয়ত বুঝিতে পারিত
না। কিন্তু মনটি তাহার
সেই নিমেষে দেবদাদার
কাছে ছুটিয়া গিয়াছিল।
গান শেষ করিয়া
তাহারা কহিল, কৈ, কি ভিক্ষে দেবে
দাও তো মা!
পার্বতী আঁচলের
গ্রন্থি খুলিয়া
টাকা-তিনটা তাহাদের
হাতে দিল। তিনজনেই অবাক
হইয়া তাহার মুখপানে
কিছুক্ষণ চাহিয়া
রহিল।
একজন বলিল, কার টাকা বাছা?
দেবদাদার।
সে তোমকে মারবে
না?
পার্বতী একটু
ভাবিয়া কহিল, না।
একজন কহিল, বেঁচে থাক
মা।
পার্বতী হাসিয়া
কহিল, তোমাদের
তিনজনের বেশ ভাগে
মিলেচে, না গো?
তিনজনেই মাথা
নাড়িয়া বলিল, তা মিলেচে।
রাধারানী
তোমার ভাল করুন।
বলিয়া
তাহারা আন্তরিক
আশীর্বাদ করিয়া
গেল, যেন
এই দানশীলা ছোট
মেয়েটি শাস্তি
ভোগ না করে। পার্বতী
সেদিন সকাল সকাল
বাড়ি ফিরিয়া
আসিল। পরদিন সকালবেলাই
দেবদাসের সহিত
তাহার দেখা হইল।
তার হাতে
একটা লাটাই ছিল-তবে
ঘুড়ি নাই, সেইটা কিনিতে
হইবে। পার্বতীকে
কাছে পাইয়া কহিল, পারু, টাকা দে।
পার্বতীর মুখ
শুকাইল,-বলিল, টাকা নেই!
কি হল?
বোষ্টমীদের
দিয়ে দিয়েচি।
তারা গান
গেয়েছিল।
সব দিয়ে দিয়েচিস?
সব। তিনটি টাকা
ত ছিল।
দূর গাধা, সব বুঝি দিতে
হয়!
বাঃ! তারা যে
তিনজন ছিল! তিন
টাকা না দিলে তিনজনের
কি ভাগে মেলে?
দেবদাস গম্ভীর
হইয়া বলিল, আমি হলে দুই
টাকা দিতুম, বলিয়া সে
লাটাইয়ের বাঁট
দিয়া মাটির উপর
আঁচড় কাটিয়া
কহিল, তা হলে
তারা দশ আনা তের
গণ্ডা এক কড়া
এক ক্রান্তি ভাগে
পেত।
পার্বতী ভাবিয়া
কহিল, তারা
কি তোমার মত আঁক
কষতে জানে?
দেবদাস মণকষা
পর্যন্ত পড়িয়াছিল; পার্বতীর কথাটায়
খুশী হইয়া কহিল, তা বটে!
পার্বতী দেবদাসের
হাত ধরিয়া বলিল, আমি ভেবেছিলুম
তুমি আমাকে মারবে, দেবদা।
দেবদাস বিস্মিত
হইল-মারব কেন?
বোষ্টমীরা
বলেছিল, তুমি আমাকে মারবে।
কথা শুনিয়া
দেবদাস মহা খুশী
হইয়া পার্বতীর
কাঁধের উপর ভর
দিয়া কহিল, দূর- না দোষ
করলে কি আমি মারি?
দেবদাস বোধ
হয় মনে করিয়াছিল
যে, পার্বতীর এ
কাজটা তাহার পিনাল
কোডের ভিতরে পড়ে
না; কেননা, তিন টাকা তিনজনে
বেশ ভাগ করিয়া
লইতে পারিয়াছে।
বিশেষতঃ, যে বোষ্টমীরা
পাঠশালায় মণকষা
পর্যন্ত পড়ে নাই
তাহাদিগকে তিন
টাকার বদলে দুই
টাকা দিলে, তাহাদের প্রতি
কতকটা অত্যাচার
করা হইত। তাহার পর সে
পার্বতীর হাত ধরিয়া
ঘুড়ি কিনিবার
জন্য ছোটবাজারের
দিকে চলিল,-লাটাইটা সেইখানে
একটা ঝোপের মধ্যে
লুকাইয়া রাখিয়া
দিল।