
প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয়
লাইব্রেরি
প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয়, তেজগাঁও, ঢাকা
স্বত্বমুক্ত বাংলা বই
একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম
চতুর্থ
পরিচ্ছেদ
এমনি
করিয়া এক বৎসর
কাটিল বটে, কিন্তু আর
কাটিতে চাহে না। দেবদাসের জননী
বড় গোলযোগ করিতে
লাগিলেন। স্বামীকে ডাকিয়া
বলিলেন, দেবা যে মুখ্যু
চাষা হয়ে গেল,-একটা যা হয়
উপায় কর।
তিনি
ভাবিয়া বলিলেন, দেবা কলকাতায়
যাক। নগেনের বাসায়
থেকে বেশ পড়াশুনা
করতে পারবে।
নগেনবাবু
সম্পর্কে দেবদাসের
মাতুল হইতেন। কথাটা সবাই শুনিল। পার্বতী শুনিয়া
ভীত হইয়া উঠিল। দেবদাসকে একা
পাইয়া তাহার হাত
ধরিয়া ঝুলিতে
ঝুলিতে বলিল, দেবদা, তুমি বুঝি
কলকাতা যাবে?
কে
বললে?
জেঠামশাই
বলেচেন।
দূর-আমি
কিছুতে যাব না।
আর
যদি জোর করে পাঠিয়ে
দেন?
জোর?
দেবদাস
এই সময় এমন একটা
মুখের ভাব করিল, যাহাতে পার্বতী
বেশ বুঝিল যে, জোর করিয়া
কোন কাজ তাহাকে
দিয়া করাইবার
জন্য এ পৃথিবীতে
কেহ নাই। সেও ত তাহাই চায়। অতএব, নিরতিশয় আনন্দে
আর একবার তাহার
হাত ধরিয়া, আর একবার ঝুলিয়া
এ-পাশ ও-পাশ করিয়া
মুখপানে চাহিয়া
হাসিয়া কহিল, দেখো, যেন যেয়ো
না দেবদা।
কখ্খন
না-
এ প্রতিজ্ঞা
কিন্তু তাহার রহিল
না। তাহার পিতা
রীতিমত বকাঝকা
করিয়া, এমন কি তিরস্কার
ও প্রহার করিয়া
ধর্মদাসকে সঙ্গে
দিয়া তাহাকে কলিকাতায়
পাঠাইয়া দিলেন। যাইবার
দিন দেবদাস মনের
মধ্যে বড় কেশ
অনুভব করিল; নূতন স্থানে
যাইতেছে বলিয়া
তাহার কিছুমাত্র
কৌতূহল বা আনন্দ
হইল না। পার্বতী
সেদিন তাহাকে কিছুতেই
ছাড়িতে চাহে না। কত কান্নাকাটি
করিল, কিন্তু কে তাহার
কথা শুনিবে? প্রথমে অভিমানে
কিছুক্ষণ দেবদাসের
সহিত কথা কহিল
না; কিন্তু শেষে যখন
দেবদাস ডাকিয়া
বলিল, পারু, আবার শিগগির
আসব; যদি না পাঠিয়ে
দেয় ত পালিয়ে
আসব।
তখন
পার্বতী প্রকৃতিস্থা
হইয়া নিজের ক্ষুদ্র
হৃদয়ের অনেক কথা
কহিয়া শুনাইল। তাহার
পর ঘোড়ার গাড়ি
চড়িয়া, পোর্টমাণ্টো
লইয়া, জননীর আশীর্বাদ
ও চক্ষের জলের
শেষ বিন্দুটি কপালে
টিপের মত পরিয়া
দেবদাস চলিয়া
গেল।
তখন
পার্বতীর কত কষ্ট
হইল; কত চোখের জলের
ধারা গাল বহিয়া
নীচে পড়িতে লাগিল; কত অভিমানে
তাহার বুক ফাটিতে
লাগিল। প্রথম
কয়েকদিন তাহার
এইরূপে কাটিল। তাহার পর হঠাৎ
একদিন প্রাতঃকালে
উঠিয়া দেখিতে
পাইল, সমস্তদিনের জন্য
তাহার কিছুই করিবার
নাই। ইতিপূর্বে
পাঠশালা ছাড়িয়া
অবধি প্রাতঃকাল
হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত
শুধু গোলমালে, হুজুগে কাটিয়া
যাইত; কত কি যেন তাহার
করিবার আছে,-শুধু সময়ে
কুলাইয়া উঠে না। এখন অনেক সময়, কিন্তু এতটুকু
কাজ খুঁজিয়া পায়
না। সকালবেলা উঠিয়া
কোনদিন চিঠি লিখিতে
বসে। বেলা দশটা
বাজিয়া যায়, জননী বিরক্ত
হইয়া উঠেন; পিতামহী শুনিয়া
বলেন, আহা, তা লিখুক। সকালবেলা ছুটোছুটি
না করিয়া লেখাপড়া
করা ভাল।
আবার
যেদিন দেবদাসের
পত্র আইসে, সেদিনটি পার্বতীর
বড় সুখের দিন। সিঁড়ির দ্বারে
চৌকাঠের উপর কাগজখানি
হাতে লইয়া সারাদিন
তাহাই পড়িতে থাকে। শেষে মাস-দুই অতিবাহিত
হইয়া গেল। পত্র লেখা কিংবা
পাওয়া আর তত ঘন
ঘন হয় না; উৎসাহটা যেন
কিছু কিছু কমিয়া
আসিয়াছে।
একদিন
পার্বতী সকালবেলায়
জননীকে বলিল, মা, আমি আবার পাঠশালায়
যাব।
কেন
রে?-তিনি কিছু বিস্মিত
হইয়াছিলেন।
পার্বতী
ঘাড় নাড়িয়া
বলিল, আমি নিশ্চয় যাব।
তা
যাস। পাঠশালা যেতে
আমি আর কবে তোকে
মানা করেচি মা?
সেইদিন
দ্বিপ্রহরে পার্বতী
দাসীর হাত ধরিয়া, বহুদিন-পরিত্যক্ত
শ্লেট ও বইখানি
খুঁজিয়া বাহির
করিয়া, সেই পুরাতন
স্থানে গিয়া শান্ত, ধীরভাবে উপবেশন
করিল।
দাসী
কহিল, গুরুমশাই, পারুকে আর
মারধর করো না; আপনার ইচ্ছায়
পড়তে এসেছে। যখন তার ইচ্ছে
হবে পড়বে, যখন ইচ্ছা
হবে না বাড়ি চলে
যাবে।
পণ্ডিত
মহাশয় মনে মনে
কহিলেন, তথাস্তু। মুখে বলিলেন, তাই হবে।
একবার
তাঁহার এমন ইচ্ছাও
হইয়াছিল যে জিজ্ঞাসা
করেন, পার্বতীকেও কেন
কলিকাতায় পাঠাইয়া
দেওয়া হইল না। কিন্তু সে কথা
কহিলেন না। পার্বতী দেখিল, সেইখানে সেই
বেঞ্চের উপরেই
সর্দার-পোড়ো ভুলো
বসিয়া আছে। তাহাকে দেখিয়া
প্রথমে একবার হাসি
আসিবার মত হইল, কিন্তু, পরক্ষণেই চোখে
জল আসিল। তাহার পর তাহার
ভুলোর উপর বড়
রাগ হইল। মনে হইল, যেন সে-ই শুধু
দেবদাসকে গৃহছাড়া
করিয়াছে। এমন করিয়াও অনেক
দিন কাটিয়া গেল।
অনেক
দিনের পর দেবদাস
বাটী ফিরিয়া আসিল। পার্বতী কাছে
ছুটিয়া আসিল-অনেক
কথাবার্তা হইল। তাহার বেশী কিছু
বলিবার ছিল না,-থাকিলেও বলিতে
পারিল না। কিন্তু দেবদাস
অনেক কথা কহিল। সমস্তই প্রায়
কলিকাতার কথা। তাহার পর, একদিন গ্রীষ্মের
ছুটি ফুরাইল। দেবদাস আবার কলিকাতায়
চলিয়া গেল। এবারও কান্নাকাটি
হইল বটে, কিন্তু সেবারের
মত তাহাতে তেমন
গভীরতা রহিল না। এমনি করিয়া চারি
বৎসর কাটিয়া গেল। এই কয় বৎসরে দেবদাসের
স্বভাবের এত পরিবর্তন
হইয়াছে যে, দেখিয়া পার্বতী
গোপনে কাঁদিয়া
অনেকবার চক্ষু
মুছিল। ইতিপূর্বে
দেবদাসের যে-সমস্ত
গ্রাম্যতা-দোষ
ছিল, শহরে বাস করিয়া
সে-সব আর একেবারে
নাই। এখন তাহার
বিলাতী জুতা, ভাল জামা, কাপড়, ছড়ি, সোনার ঘড়ি-চেন, বোতাম-এ-সব
না হইলে বড় লজ্জা
করে। গ্রামে নদীতীরে
বেড়াইতে আর সাধ
যায় না; বরং তাহার
পরিবর্তে বন্দুক-হাতে
শিকারে বাহির হইতেই
আনন্দ পায়। ক্ষুদ্র পুঁটিমাছ
ধরার বদলে বড়
মাছ খেলাইতে ইচ্ছে
হয়। শুধু কি তাই? সমাজের কথা,রাজনীতির চর্চা,সভা-সমিতি-ক্রিকেট, ফুটবলের আলোচনা। হায় রে! কোথায়
সেই পার্বতী, আর তাহাদের
সেই তালসোনাপুর
গ্রাম! বাল্যস্মৃতিজড়িত
দুই-একটা সুখের
কথা যে এখন আর মনে
পড়ে না, তাহা নয়-কিন্তু
নানা কাজের উৎসাহে
সে-সকল আর বেশীক্ষণ
হৃদয়ে স্থান পায়
না।
আবার
গ্রীষ্মের ছুটি
হইল। পূর্ব বৎসর
গ্রীষ্মাবকাশে
দেবদাস বিদেশ বেড়াইতে
গিয়াছিল, বাটী যায়
নাই। এবার পিতামাতা
উভয়েই জিদ করিয়া
পত্র লিখিয়াছেন, তাই ইচ্ছা
না থাকিলেও দেবদাস
বিছানাপত্র বাঁধিয়া
তালসোনাপুর গ্রামের
জন্য হাওড়া স্টেশনে
আসিয়া উপস্থিত
হইল। যেদিন বাটী
আসিল, সেদিন তাহার শরীর
তেমন ভাল ছিল না, তাই বাহির
হইতে পারিল না। পরদিন পার্বতীদের
বাটীতে আসিয়া
ডাকিল, খুড়ীমা!
পার্বতীর
জননী আদর করিয়া
ডকিলেন, এস বাবা, ব'স।
খুড়ীমার
সহিত কিছুক্ষণ
কথাবার্তার পর
দেবদাস জিজ্ঞাসা
করিল, পারু কোথায় খুড়ীমা?
ঐ বুঝি
ওপরের ঘরে আছে।
দেবদাস
উপরে আসিয়া দেখিল, পার্বতী সন্ধ্যাদীপ
জ্বালিতেছে; ডাকিল, পারু!
প্রথমে
পার্বতী চমকিত
হইয়া উঠিল, তারপর প্রণাম
করিয়া সরিয়া
দাঁড়াইল।
কি
হচ্ছে পারু?
সে
কথা আর বলিবার
প্রয়োজন নাই-তাই
পার্বতী চুপ করিয়া
রহিল। তার
পর, দেবদাসের লজ্জা
করিতে লাগিল-কহিল, যাই, সন্ধ্যা হয়ে
গেল। শরীরটা ভাল
নয়।
দেবদাস
চলিয়া গেল।