
প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয়
লাইব্রেরি
প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয়, তেজগাঁও, ঢাকা
স্বত্বমুক্ত বাংলা বই
একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম
সপ্তম
পরিচ্ছেদ
পরদিন
পিতার সহিত দেবদাসের
অল্পক্ষণের জন্য
কথাবার্তা হইল।
পিতা
কহিলেন, তুমি চিরদিন
আমাকে জ্বালাতন
করিয়াছ, যতদিন বাঁচিব, ততদিনই জ্বালাতন
হইতে হইবে। তোমার মুখে এ কথায়
আশ্চর্য হইবার
কিছু নাই।
দেবদাস
নিঃশব্দে অধোবদনে
বসিয়া রহিল।
পিতা
কহিলেন, আমি ইহার ভিতর
নাই। যা ইচ্ছা হয়, তুমি ও তোমার
জননীতে মিলিয়া
কর।
দেবদাসের
জননী এ কথা শুনিয়া
কাঁদিয়া কহিলেন-বাবা, এতও আমার অদৃষ্টে
ছিল!
সেই
দিন দেবদাস তোড়জোড়
বাঁধিয়া কলিকাতায়
চলিয়া গেল।
পার্বতী
এ কথা শুনিয়া
কঠোর মুখে আরও
কঠিন হাসিয়া চুপ
করিয়া রহিল। গতরাত্রের কথা
কেহই জানে না, সেও কাহাকে
কহিল না। তবে মনোরমা আসিয়া
ধরিয়া বসিল, পারু, শুনলাম দেবদাস
চলে গেছে?
হাঁ-
তবে, তোর উপায়
কি করেচে?
উপায়ের
কথা সে নিজেই জানে
না, অপরকে কি বলিবে? আজ কয়দিন
হইতে সে নিরন্তর
ইহাই ভাবিতেছিল। কিন্তু কোনক্রমেই
স্থির করিতে পারিতেছিল
না যে, তাহার আশা কতখানি
এবং নিরাশা কতখানি। তবে একটা কথা এই
যে, মানুষ এমনি দুঃসময়ের
মাঝে আশা-নিরাশার
কুলকিনারা যখন
দেখিতে পায় না, তখন দুর্বল
মনে বড় ভয়ে ভয়ে
আশার দিকটাই চাপিয়া
ধরিয়া থাকে। যেটা হইলে তাহার
মঙ্গল, সেইটাই আশা
করে। ইচ্ছায় বা
অনিচ্ছায় সেই
দিক পানেই নিতান্ত
উৎসুক নয়নে চাহিয়া
দেখিতে চাহে। পার্বতীর এই অবস্থায়
সে কতকটা জোর করিয়া
আশা করিতেছিল যে, কাল রাত্রের
কথাটা নিশ্চয়ই
বিফল হইবে না। বিফল হইলে তাহার
দশা কি হইবে, এটা তাহার
চিন্তার বাহিরে
গিয়া পড়িয়াছিল। তাই সে ভাবিতেছিল, দেবদাদা আবার
আসিবে, আবার আমাকে
ডাকিয়া বলিবে, পারু, তোমাকে আমি
সাধ্য থাকিতে পরের
হাতে দিতে পারিব
না।
কিন্তু
দিন-দুই পরে পার্বতী
এইরূপ পত্র পাইল-
পার্বতী, আজ দুইদিন
হইতে তোমার কথাই
ভাবিয়াছি। পিতামাতার কাহারও
ইচ্ছা নহে যে, আমাদের বিবাহ
হয়। তোমাকে সুখী
করিতে হইলে, তাঁহাদিগকে
এতবড় আঘাত দিতে
হইবে, যাহা আমার দ্বারা
অসাধ্য। তা ছাড়া, তাঁহাদের বিরুদ্ধে
এ কাজ করিবই বা
কেমন করিয়া? তোমাকে আর
যে কখন পত্র লিখিব, আপাততঃ এমন
কথা ভাবিতে পারিতেছি
না। তাই এ পত্রেই
সমস্ত খুলিয়া
লিখিতেছি। তোমাদের ঘর নীচু। বেচা-কেনা ঘরের
মেয়ে মা কোনমতেই
ঘরে আনিবেন না; এবং ঘরের পাশে
কুটু', ইহাই তাঁহার মতে
নিতান্ত কদর্য। বাবার কথা-সে ত
তুমি সমস্তই জান। সে রাত্রের কথা
মনে করিয়া বড়
কেশ পাইতেছি। কারণ, তোমার মত অভিমানিনী
মেয়ে কতবড় ব্যথায়
যে সে-কাজ পারিয়াছিল, সে আমি জানি।
আর
এক কথা- তোমাকে
আমি যে বড় ভালবাসিতাম, তাহা আমার
কোনদিন মনে হয়
নাই-আজিও তোমার
জন্য আমার অন্তরের
মধ্যে নিরতিশয়
কেশ বোধ করিতেছি
না। শুধু এই আমার
বড় দুঃখ যে, তুমি আমার
জন্য কষ্ট পাইবে। চেষ্টা করিয়া
আমাকে ভুলিও, এবং আন্তরিক
আশীর্বাদ করি, তুমি সফল হও।
-দেবদাস।
পত্রখানা
যতক্ষণ দেবদাস
ডাকঘরে নিক্ষেপ
করে নাই, ততক্ষণ এক
কথা ভাবিয়াছিল; কিন্তু রওনা
করিবার পরমুহূর্ত
হইতেই অন্য কথা
ভাবিতে লাগিল। হাতের ঢিল ছুঁড়িয়া
দিয়া একদৃষ্টে
সেই দিকে চাহিয়া
রহিল। একটা
অনির্দিষ্ট শঙ্কা
তাহার মনের মাঝে
ক্রমে ক্রমে জড়
হইতেছিল। সে ভাবিতেছিল, এ ঢিলটা তাহার
মাথায় কিভাবে
পড়িবে। খুব লাগিবে কি? বাঁচিবে ত? সে-রাত্রে
পায়ের উপর মাথা
রাখিয়া সে কেমন
করিয়া কাঁদিয়াছিল, পোস্ট অফিস
হইতে বাসায় ফিরিবার
পথে প্রতি পদক্ষেপে
দেবদাসের ইহাই
মনে পড়িতেছিল। কাজটা ভাল হইল
কি? এবং সকলের উপরে
দেবদাস এই ভাবিতেছিল
যে, পার্বতীর নিজের
যখন কোন দোষ নাই, তখন কেন পিতামাতা
নিষেধ করেন? বয়সের বৃদ্ধির
সহিত, এবং কলিকাতায়
থাকিয়া, সে এই কথাটি
বুঝিতে পারিতেছিল
যে, শুধু-লোক-দেখানো
কুলমর্যাদা এবং
একটা হীন খেয়ালের
উপর নির্ভর করিয়া
নিরর্থক একটা প্রাণনাশ
করিতে নাই। যদি পার্বতী না
বাঁচিতে চাহে, যদি সে নদীর
জলে অন্তরের জ্বালা
জুড়াইতে ছুটিয়া
যায়, তা হইলে বিশ্বপতির
চরণে কি একটা মহাপাতকের
দাগ পড়িবে না?
বাসায়
আসিয়া দেবদাস
আপনার ঘরে শুইয়া
পড়িল। আজকাল
সে একটা মেসে থাকে। মাতুলের আশ্রয়
সে অনেকদিন ছাড়িয়া
দিয়াছে,-সেখানে তাহার
কিছুতেই সুবিধা
হইত না। যে ঘরে
দেবদাস থাকে, তাহারই পাশের
ঘরে চুনিলাল বলিয়া
একজন যুবক আজ নয়
বৎসর হইতে বাস
করিয়া আসিতেছেন। তাঁহার এই দীর্ঘ
কলিকাতা বাস বি
এ পাস করিবার জন্য
অতিবাহিত হইয়াছে-আজিও
সফলকাম হইতে পারেন
নাই বলিয়া এখনো
এইখানেই তাঁহাকে
থাকিতে হইয়াছে। চুনিলাল
তাঁহার নিত্যকর্ম
সান্ধ্যভ্রমণে
বাহির হইয়াছেন, ভোর নাগাদ
বাটী ফিরিবেন। বাসায়
আর কেহ এখনও আসেন
নাই। ঝি আলো জ্বালিয়া
দিয়া গেল, দেবদাস দ্বার
রুদ্ধ করিয়া শুইয়া
পড়িল।
তাহার
পর একে একে সকলে
ফিরিয়া আসিল। খাইবার সময় দেবদাসকে
ডাকাডাকি করিল, কিন্তু সে
উঠিল না। চুনিলাল কোনদিন
রাত্রে বাসায়
আসে না, আজিও আসে নাই।
তখন
রাত্রি একটা বাজিয়া
গিয়াছে। বাসায় দেবদাস
ব্যতীত কেহই জাগিয়া
নাই। চুনিলাল
গৃহপ্রত্যাবর্তন
করিয়া দেবদাসের
ঘরের সম্মুখে দাঁড়াইয়া
দেখিল, দ্বার রুদ্ধ
কিন্তু আলো জ্বলিতেছে; ডাকিল, দেবদাস কি
জেগে আছ নাকি হে?
দেবদাস
ভিতর হইতে কহিল, আছি, তুমি এর মধ্যে
ফিরলে যে?
চুনিলাল
ঈষৎ হাসিয়া কহিল, হাঁ, শরীরটা আজ
ভাল নেই, বলিয়া চলিয়া
গেল। কিছুক্ষণ পরে
ফিরিয়া আসিয়া
কহিল, দেবদাস, একবার দ্বার
খুলতে পার?
পারি, কেন?
তামাকের
জোগাড় আছে?
আছে। বলিয়া দেবদাস
দ্বার খুলিয়া
দিল। চুনিলাল তামাক
সাজিতে বসিয়া
কহিল; দেবদাস, এখনো জেগে
কেন?
রোজ
রোজই কি ঘুম হয়?
হয়
না?
চুনিলাল
যেন একটু বিদ্রূপ
করিয়া কহিল, আমি ভাবতুম
তোমাদের মত ভাল
ছেলেরা কখনো দুপুর
রাত্রের মুখ দেখেনি-আমার
আজ একটা নূতন শিক্ষা
হল।
দেবদাস
কথা কহিল না। চুনিলাল আপনার
মনে তামাক খাইতে
খাইতে কহিল, দেবদাস, বাড়ি থেকে
ফিরে এসে পর্যন্ত
যেন ভাল নেই। তোমার মনে যেন
কি কেশ আছে।
দেবদাস
অন্যমনস্ক হইয়াছিল। জবাব দিল না।
মনটা
ভাল নেই, না হে?
দেবদাস
হঠাৎ বিছানার উপর
উঠিয়া বসিল। ব্যগ্রভাবে তাহার
মুখপানে চাহিয়া
বলিল, আচ্ছা চুনিবাবু, তোমার মনে
কি কোন ক্লেশ নেই?
চুনিলাল
হাসিয়া উঠিল-কিছু
না।
কখন
এ জীবনে ক্লেশ
পাওনি?
এ কথা
কেন?
আমার
শুনতে বড় সাধ
হয়।
তা
হলে আর একদিন শুনো।
দেবদাস
বলিল, আচ্ছা, চুনি, তুমি সারারাত্রি
কোথায় থাক?
চুনিলাল
মৃদু হাসিয়া কহিল, তা কি তুমি
জানো না?
জানি, কিন্তু ঠিক
জানিনে।
চুনিলালের
মুখ উৎসাহে উজ্জ্বল
হইয়া উঠিল। এ-সব আলোচনার মধ্যে
আর কিছু না থাক, একটা চক্ষুলজ্জাও
যে আছে, দীর্ঘ অভ্যাসের
দোষে সে তাহাও
বিস্মৃত হইয়াছিল। কৌতুক করিয়া
চক্ষু মুদিয়া
বলিল, দেবদাস, ভাল করে জানতে
হলে কিন্তু ঠিক
আমার মত হওয়া
চাই। কাল আমার সঙ্গে
যাবে?
দেবদাস
একবার ভাবিয়া
দেখিল। তাহার
পর কহিল, শুনি, সেখানে নাকি
খুব আমোদ পাওয়া
যায়। কোন
কষ্ট মনে থাকে
না; এ কি সত্যি?
একেবারে
খাঁটি সত্যি।
তা
যদি হয়, ত আমাকে নিয়ে
যেয়ো-আমি যাবো।
পরদিন
সন্ধ্যার প্রাক্কালে
চুনিলাল দেবদাসের
ঘরে আসিয়া দেখিল, সে ব্যস্তভাবে
জিনিসপত্র বাঁধিয়া
গুছাইয়া সাজাইয়া
লইতেছে। বিস্মিত হইয়া
জিজ্ঞাসা করিল, কি হে, যাবে না?
দেবদাস
কোনদিকে না চাহিয়া
কহিল, হাঁ, যাবো বৈ কি।
তবে
এ-সব কি করচ?
যাবার
উদ্যোগ করচি।
চুনিলাল
ঈষৎ হাসিয়া ভাবিল, মন্দ উদ্যোগ
নয়; কহিল, ঘরবাড়ি কি
সব সেখানে নিয়ে
যাবে নাকি হে?
তবে
কার কাছে রেখে
যাব?
চুনিলাল
বুঝিতে পারিল না। কহিল, জিনিসপত্র
আমি কার কাছে রেখে
যাই? সব ত বাসায় পড়ে
থাকে।
দেবদাস
যেন হঠাৎ সচেতন
হইয়া চোখ তুলিল। লজ্জিত হইয়া
কহিল, চুনিবাবু, আজ আমি বাড়ি
যাচ্ছি।
সে
কি হে? কবে আসবে?
দেবদাস
মাথা নাড়িয়া
বলিল, আমি আর আসব না।
বিস্ময়ে
চুনিলাল তাহার
মুখপানে চাহিয়া
রহিল। দেবদাস
কহিতে লাগিল-এই
টাকা নাও; আমার যা কিছু
ধার আছে, এই থেকে শোধ
করে দিয়ো। যদি কিছু বাঁচে, বাসার দাসী-চাকরকে
বিলিয়ে দিয়ো। আমি আর কখনো কলকাতায়
ফিরব না।
মনে
মনে বলিতে লাগিল, কলকাতায় এসে
আমার অনেক গেছে, অনেক গেছে।
আজ
যৌবনের কুয়াশাচ্ছন্ন
আঁধার ভেদ করিয়া
তাহার চোখে পড়িতেছে-সেই
দুর্দান্ত দুর্বিনীত
কিশোর বয়সের সেই
অযাচিত পদদলিত
রত্ন আজ সমস্ত
কলিকাতার তুলনাতেও
যেন অনেক বড়, অনেক দামী। চুনিলালের মুখপানে
চাহিয়া বলিল, চুনি শিক্ষা
বিদ্যা বুদ্ধি
জ্ঞান উন্নতি-যা
কিছু, সব সুখের জন্য। যেমন করেই দেখ
না কেন, নিজের সুখ
বাড়ানো ছাড়া
এ-সকল আর কিছুই
নয়-
চুনিলাল
বাধা দিয়া বলিয়া
উঠিল, তবে তুমি কি আর
লেখাপড়া করবে
না নাকি?
না। লেখাপড়ার জন্যে
আমার যথেষ্ট ক্ষতি
হয়েছে। আগে যদি জানতাম, এতখানির বদলে
আমার এইটুকু লেখাপড়া
হবে, তাহলে আমি জন্মে
কখনো কলিকাতার
মুখ দেখতাম না।
তোমার
হয়েছে কি?
দেবদাস
ভাবিতে বসিল; কিছুক্ষণ পরে
কহিল, আবার যদি কখন দেখা
হয়, সব কথা বলব।
রাত্রি
তখন প্রায় নয়টা
বাজিয়াছে। বাসায় সকলে এবং
চুনিলাল নিরতিশয়
বিস্মিত হইয়া
দেখিল, দেবদাস গাড়িতে
সমস্ত দ্রব্যাদি
বোঝাই করিয়া চিরদিনের
মত বাসা পরিত্যাগ
করিয়া বাটী চলিয়া
গেল। সে চলিয়া
গেলে চুনিলাল রাগ
করিয়া বাসার অপর
সকলকে বলিতে লাগিল-এইরকম
ভিজে-বেড়ালগোছ
লোকগুলোকে আদতে
চিনিতে পারা যায়
না।